ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় মসজিদ কুষ্টিয়ার শাহী মসজিদ। এ মসজিদটি দর্শনে প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থীর আগমন ঘটে জেলার অজপাড়া গাঁ নিভৃত পল্লী ঝাউদিয়ায়। কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ঝাউদিয়া গ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং কুষ্টিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

শত শত দর্শক আর ভ্রমন পিপাসুদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে এ স্থানটি। কিন্তু দর্শকদের জন্য তেমন সুযোগ সুবিধা নেই এখানে। নেই তেমন বিশ্রামের জায়গা। নেই থাকা ও খাওয়ার সুবিধা। ফলে এ স্থানটি দর্শনীয় হওয়া সত্ত্বেও দর্শকদের জন্য সুযোগ সুবিধা না থাকায় এ স্থানটির সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। মসজিদটির দীর্ঘদিন উন্নয়ন না থাকায় জৌলুসও নষ্ট হতে বসেছে। মসজিদের মূল কাঠামোতে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। চার কোণে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মিনারসদৃশ উঁচু কাঠামো। দেয়াল, খিলান ও গম্বুজের নকশায় ফুটে উঠেছে প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের সৌন্দর্য। ইট ও চুন-সুরকির নির্মাণশৈলী এবং নান্দনিক কারুকাজ মসজিদটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

জানা যায়, এদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য অনেক ওলি আউলিয়া এসেছিলেন বাংলাদেশে। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তারা নিজেদের জানমাল সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ধর্ম প্রচারসহ সকল দ্বীনি কর্মকান্ডের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছিলেন মসজিদকে। সেই হিসাবে বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছিলেন মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ।

কুষ্টিয়া ইবি থানার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী ঝাউদিয়া গ্রাম। এই গ্রামে সম্রাট শাজাহানের আমলে ঐতিহ্যবাহি শাহী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ থেকে তিনশত বছর পূর্বে সম্রাট শাহজাহান এই মসজিদ নির্মান ব্যয় বহন করেন। সে সময় মসজিদটির নির্মান কাজ পরিচালনা করেন শাহ্ সুফি আদারী মিয়া চৌধুরী। উপ-মহাদেশ থেকে আসা ধর্ম প্রচারক শাহ্ সুফি আদারী মিয়া চৌধুরী ৮৫ বছরে বয়সে এখানে মৃত্যু বরণ করেন। ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে তিনি কোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়।

তার মৃত্যুর পর ১৯৬৯ সালে সুনামধন্য ব্যক্তি হাসান চৌধুরী তৎকালীন সরকারের সাথে একটি রেজিঃ চুক্তিনামা অনুযায়ী মসজিদটি প্রত্মত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। চুক্তিনামা অনুযায়ী এই মসজিদের মতওয়ালী (তত্বাবধায়ক) হিসেবে থাকবে হাসান আলী চৌধুরী অথবা তারই বংশধর। বর্তমানে মসজিদ কমিটিতে তারই বংশধর মসজিদটি পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর স্থাপত্যশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।

প্রতিদিন স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ দেখতে আসেন। মসজিদটির প্রাচীন স্থাপত্য, পরিবেশ ও ইতিহাস দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ শুধু একটি পুরোনো মসজিদ নয়; এটি তাঁদের এলাকার গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কুষ্টিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে আরও পরিচিতি পেতে পারে।

অনেকের ধারণা মসজিদটি গায়েবীভাবে তৈরি হয়েছে। এ জন্য সুদর্শন মসজিদটি পরিদর্শনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত মানুষের ভীড় করেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবারে এখানে লোক ধারণের জায়গা থাকেনা। অনেকেই মান্নত গরু,ছাগল, হাঁস, মুরগী নিয়ে এখানে উপস্থিত হন। মসজিদটিকে ঘিরে কিছু কুটির শিল্পের লোকজনও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ তাই কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি একটি মূল্যবান প্রত্মত্ত্ব ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্যসৌন্দর্য সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।