আব্দুল ওয়াদুদ সরদার

ইতিহাসে প্রতিটি জাতির জীবনে এমন কিছু মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যেদিন রক্ত কেবল মাটিকেই রঞ্জিত করে না; বরং একটি সমগ্র জাতির চেতনা, বিবেক ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস ছিল ঠিক তেমনি এক রক্তস্নাত ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, আত্মত্যাগ, অদম্য সাহস, অশ্রু ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া একটি সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন একসময় যেভাবে ইতিহাসের নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, তা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র, শ্রমিক ও সর্বস্তরের জনতার জাগ্রত বিবেক।

একজন শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে সমাবেশগুলোতে উপস্থিত থাকা ছিল আমার নিয়মিত কাজ। উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনে নিজেকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রত্যক্ষ করা, মানুষের তাজা আবেগ অনুধাবন করা এবং ইতিহাস সৃষ্টির মুহূর্তগুলো কাছ থেকে দেখা। কিন্তু রিপোর্ট করার পাশাপাশি আমিও একসময় এই ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশে পরিণত হই। আন্দোলনের তীব্র এক পর্যায়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সাথে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে আমি রাস্তার পাশের এক গভীর নর্দমায় ছিটকে পড়ি। ডান পায়ে একাধিক মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয় এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি। কিন্তু শরীর ঘরে আবদ্ধ থাকলেও আমার মন পড়ে ছিল উত্তাল রাজপথেই। কারওয়ান বাজার মোড়ে আন্দোলনের সময় স্বৈরাচারী শাসনের দোসরদের ছোড়া বুলেটে আমার ঠিক পাশে থাকা ভাইটির হাত ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং চিকিৎসকের আকুল আকুতি সবই আজ আমার স্মৃতিতে অমলিন।

১৫ জুলাই বিকেলে পরিস্থিতির মোড় ভয়াবহ রূপ নেয়। হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, বিজয় একাত্তর হল ও শহীদুল্লাহ হলে আক্রমণ চালায়। হাজার হাজার রক্তাক্ত শিক্ষার্থীকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয় এবং হাসপাতালের বারান্দায় রক্ত আর আর্তনাদে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই রক্তপাত আন্দোলনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের বুলেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বীরদর্পে বুক পেতে দেন। তাঁর শাহাদাতের দৃশ্য এবং চিত্রকর্ম বুকের ভেতর তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলী কর’ বাক্যাংশটি সমগ্র বাংলাদেশকে দাবানলের মতো জাগিয়ে তোলে। ১৮ জুলাই উত্তরার মাঠে ‘পানি লাগবে কারো, পানি?’ বলে আন্দোলনকারীদের মাঝে তৃষ্ণা মেটাতে থাকা শান্ত ছেলে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ পুলিশের টার্গেটেড গুলতে শহীদ হন।

আন্দোলনের বিস্তার কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাকশ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এই গণদাবিতে সংহতি জানায়। ১৯ জুলাই আন্দোলনের তীব্রতা চরমে পৌঁছালে সরকার ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR)-এর ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১,৪০০ মানুষ শাহাদাত বরণ করেন এবং অগণিত মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সরকার আন্দোলন দমাতে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বকর মজুমদার, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুমসহ মূল সমন্বয়কদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং ডিবি হেফাজতে নিয়ে আটক রাখে। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে দেশজুড়ে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে পুরো দেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্বৈরাচারী সরকার শেষ রক্ষা করতে চেয়েছিল।

জুলাই বিপ্লব আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে, বিজয়ের প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে নয়; বরং জনগণের ঐক্যবদ্ধ চেতনায় নিহিত। বীর শহীদদের রক্ত এবং হাজারো আহতদের আত্মত্যাগের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো ঘোষিত ‘জুলাই সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে তার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রতিহিংসা ও দলাদলির রাজনীতি পরিহার করে ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও সুবিচারের ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করাই হোক ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই বিপ্লবের মূল অঙ্গীকার।