একটি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে সাধারণত তার পুরো মেয়াদের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু কোন সরকারের চরিত্র ও গতিপথ বোঝার জন্য ছয় মাস খুব কম সময়ও নয়। এ সময়ের মধ্যে বোঝা যায়, সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা নিরপেক্ষ রাখতে চায়, প্রশাসনকে কীভাবে পরিচালনা করছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের নীতি নিচ্ছে এবং নির্বাচনের সময় জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে তারা কতটা আন্তরিক প্রভৃতি। বিশেষ করে, জুলাইয়ের এত বড় একটি অভ্যুত্থানের পর যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ জনগণ এবার শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও গুণগত পরিবর্তন। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যেখানে দলীয় পরিচয় নয়, বরং যোগ্যতা হবে নিয়োগের ভিত্তি; নির্বাচিত প্রতিনিধি নয় এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হয়ে উঠবেন না; প্রশাসন কোনো দলের আনুগত্যের ওপর চলবে না; বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে জ্ঞানচর্চার মূল কেন্দ্র, ক্যাম্পাসগুলো রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে না; আর বিরোধী মতকে দমন না করে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে। নতুন সরকারের ছয় মাস পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই অর্থনীতি বা রাজনীতির কোনো একটি নির্দিষ্ট সূচক নয়। বরং প্রশ্নটি আরও গভীর। “যে দলীয়করণ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, সে সংস্কৃতি কি সত্যিই ভেঙেছে, নাকি শুধু সুবিধাভোগীদের পরিচয় বদলেছে?”

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সরকারের প্রথম ছয় মাসের বেশ কিছু নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও অভিযোগ সামনে আনতেই হয়। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো, সরকারি চাকরি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও মেধার চেয়ে দলীয় সংশ্লিষ্টতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিযোগটি অত্যন্ত স্পষ্ট: সরকারি চাকরিতে প্রবেশ বা পদোন্নতির জন্য যে মেধা, পরীক্ষা ও মৌখিক মূল্যায়ন মূল মানদণ্ড হওয়ার কথা ছিল তা এখন আর কার্যকর নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কই কার্যত সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে উঠছে। সরকারি অফিসগুলো দলীয় কর্মীদের পুনর্বাসনের জায়গায় পরিণত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক দল তার সাংগঠনিক কর্মীকে দলীয় কাজে ব্যবহার করতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের চাকরি হলো জনগণের সেবা করার পেশা। সেখানে একজন কর্মকর্তা কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আর এখানেই দলীয় নিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। আওয়ামী লীগ ঠিক এ কাজটিই গত সাড়ে ১৫ বছর করেছে। বিএনপির কাছে ভিন্ন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে এর দেখা মিলছে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম মেধার পেছনে ছুটবে না; ক্ষমতার পেছনে ছুটবে। তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তথা মানবসম্পদই দুর্বল হয়ে পড়বে।

পাশাপাশি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সরকার দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এখানে প্রশ্ন শুধু কে উপাচার্য হলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কোন যোগ্যতায় তিনি নিয়োগ পেলেন? একজন উপাচার্যের কাছে একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা, শিক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং ছাত্রদের প্রতি নিরপেক্ষ আচরণের প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য প্রধান বিবেচনা হয়ে ওঠে, তাহলে উপাচার্যের পদটি একাডেমিক নেতৃত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক পুরস্কারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর পরিণতি ক্যাম্পাসে খুব দ্রুতই দেখা যায়। প্রশাসন যদি একটি নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের প্রতি পক্ষপাত দেখায়, তাহলে অন্য সংগঠনগুলো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। ছাত্ররা বুঝতে শুরু করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মের চেয়ে রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশি কার্যকর। এরপর হল দখল, প্রভাব বিস্তার, নিয়োগে পক্ষপাত, প্রশাসনিক সুবিধা এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যে নৈরাজ্য ও সহিংসতা শুরু হয়েছে কিংবা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের যে বেপরওয়া মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে এর নেপথ্য কারণও এটাই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো সরকার সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সরিয়ে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে। আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করার কথা, সেখানেও রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছের স্তর। একজন নাগরিক তার মেয়র, কাউন্সিলর কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। সে প্রতিনিধি যদি জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন, তাহলে স্থানীয় গণতন্ত্র কার্যকর থাকে। কিন্তু জনগণ একজনকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার পর সরকার যদি অন্য একজন রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিকে বাস্তব ক্ষমতার কেন্দ্রে বসিয়ে দেয়, তাহলে ভোটের রাজনৈতিক অর্থই দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এই শাসনপদ্ধতিতে ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের কাছ থেকে। আর সে বৈধতার জায়গায় যদি দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত লোকেরা বসে যায়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ যখন এ কৌশলে হেঁটেছিল তখন বিএনপি তার সমালোচনা করেছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে এখন আওয়ামী লীগের পুরোনো পথেই হাঁটছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো সমস্যা হলো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনে আনুগত্যের নতুন মানচিত্র তৈরি হওয়া। আগের সরকারের সময় যারা ক্ষমতাবান ছিলেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো বাদ পড়েন। অন্যদিকে, নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পান। তারপর কয়েক বছর পর সরকার বদলালে আবার একই প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই চক্র ভাঙার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের ছয় মাসেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় অনেকের মাঝেই হতাশা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি শুধু দলীয়করণের সুবিধাভোগী বদলাচ্ছি, নাকি দলীয়করণের ব্যবস্থাটিই বদলাতে পারছি?

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি। একজন শিক্ষক পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরপেক্ষ থাকবেন, শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য করবেন না এবং প্রতিষ্ঠানের আচরণবিধি মেনে চলবেন। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে নাগরিক হিসেবে তার সব রাজনৈতিক অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সরকার যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে কোনো নতুন বিধি বা আইন করতে চায়, তাহলে এর সাংবিধানিক ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে। রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের উচিত নয়, যাতে নাগরিকের অধিকার দলীয় পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জন্য এক ধরনের আইন আবার স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ভিন্ন আইন করা হয়, তাহলে সার্বিকভাবে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশংকা থেকেই যায়।

বিরোধী দল থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের বসিয়ে তদারকি করার পাঁয়তারা চলছে। একজন সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি যে দলেরই হোন, তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছে তার জবাবদিহি আছে। কিন্তু নির্বাচিত এমপির ওপর যদি সরকারদলীয় কোনো সংরক্ষিত আসনের এমপিকে রাজনৈতিক তদারক হিসেবে বসানো হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, জনগণের ভোটের ওপর কি দলীয় নিয়ন্ত্রণ বসানো হচ্ছে? আর অভিযোগ যদি সত্য হয় যে, নির্বাচিত বিরোধী এমপিদের উন্নয়নমূলক কাজে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না, অথচ তাদের এলাকায় বসবাসও করেন না এমন সরকারদলীয় প্রতিনিধিরা তাদের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছেন, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ উন্নয়ন বরাদ্দ কোনো দলের অনুগ্রহ নয়। এটি জনগণের অধিকার। একজন এমপি বিরোধী দলের হওয়ায় তার এলাকার মানুষ কেন সরকারি উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হবে? সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতের পার্থক্যের শাস্তি জনগণকে দেয়া হলে তা গণতান্ত্রিক শাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।

সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টিও সামনে এসেছে। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর জনগণ একটি নির্দিষ্ট সংস্কার কাঠামোর ওপর মত দিয়েছে। এখন সেই রায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকার যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে দ্বিধা করে, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবে, ভোট নেয়ার প্রয়োজনই বা কী ছিল? গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে শুধু ভোটগ্রহণের ওপর নয়, ভোটের ফলাফলের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণের ওপরও। জনগণের ভোটের ফল যদি সরকার নিজের সুবিধামতো গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো গণভোটেরই আর রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকবে না।

সরকারের ছয় মাসের অর্থনৈতিক চিত্রও একাধিক স্তরে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হয়। আর বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা থাকলে আমদানি ব্যয় ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে। কর্মসংস্থান কমলে মানুষের আয় কমে। আয় কমলে বাজারে চাহিদা কমে। আর চাহিদা কমলে ব্যবসার বিনিয়োগ আরও কমে। নতুন সরকারের মেয়াদের ৬ মাসের মধ্যে আবারও নতুন করে এরকম একটি দুষ্টুচক্রের ফাঁদে পড়ে যাওয়া সত্যিই অনাকাক্সিক্ষত।

সরকারের ৬ মাসে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ¦ালানি সংকট। গেল ৬ মাসে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং বহু শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রকৃত পরিসংখ্যান সরকারকে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু সমস্যাটির অর্থনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি কারখানা যদি নিয়মিত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পায়, তাহলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। উৎপাদন কমবে। রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমবে। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ছাঁটাইও করা হতে পারে। অতএব জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ নয়। বরং একইসঙ্গে এটি কর্মসংস্থান রক্ষারও প্রশ্ন।

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা বাজারে অতিরিক্ত মূল্য তৈরির অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হলে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়ে। বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না। যে পণ্য কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকায় বের হয়, সেটি ভোক্তার কাছে ৬০ টাকায় পৌঁছালে মাঝের ৩০ টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেটি সরকারকে জানতে হবে। বাজারের প্রতিটি স্তরে তথ্যভিত্তিক নজরদারি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ না করলে মূল্যস্ফীতির দায় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপিয়ে দিলেই হবে না।

সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, সংসদ সদস্যদের ওপর আক্রমণ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে। রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারের একটি সহজ নীতি থাকা উচিত: অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা কোনোভাবেই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়। আর যদি হামলাকারীরা ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ তখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করবে, রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? রাজনীতিতে সংঘাত কমানোর দায়িত্ব শুধু বিরোধী দলের নয়। ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব বরং বেশি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সম্ভবত সরকার পরিবর্তন নয়। সরকার পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সহজ। কঠিন হলো ক্ষমতার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা। যদি একটি নতুন সরকার পুরোনো সরকারের মতোই সরকারি চাকরিতে দলীয় আনুগত্যকে পুরস্কৃত করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ব্যক্তিকে বসায়, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেয়, প্রশাসনে ভিন্নমতের কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয় এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন যে হয়নি তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রমাণ হবে তখনই, যখন সরকার নিজের দলের লোকের জন্যও একই আইন প্রয়োগ করবে, বিরোধীর অধিকারও নিজের অধিকারের মতো রক্ষা করবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়ম তৈরি করবে যা আগামী সরকারও ইচ্ছেমতো ভাঙতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, ছয় মাস কোনো সরকারের জন্য শেষ সময় নয়। কিন্তু ছয় মাসে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ দেখা যায়, সেটিই আগামী দিনের সরকারের সামগ্রিক চরিত্রের ইঙ্গিত দেয়।