জাফর আহমাদ

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “সেদিন ধ্বংস অপেক্ষা করছে মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য।” (সুরা মুরসালাত : ১৫) মহান আল্লাহ এই বাক্যটিকে সুরা মুরসালাতে মোট ১০ বার উল্লেখ করেছেন। সে সব লোকের জন্য যারা আখিরাত দিনের আগমনের খবরকে মিথ্যা বলে মনে করেছিল এবং এ ভেবে পৃথিবীতে জীবন যাপন করে চলছিল যে, এমন সময় কখনো আসবে না যখন প্রভুর সামনে হাজির হয়ে নিজের কাজ-কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

“সেদিন ধ্বংস অপেক্ষা করছে মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য।”(সুরা মুরসালাত:১৯) এখানে আয়াতটির অর্থ হলো, দুনিয়াতে তাদের যে পরিণতি হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে হবে তা তাদের আসল শাস্তি নয়। তাদের ওপর আসল ধ্বংস নেমে আসবে চূড়ান্ত ফায়সালার দিনে। এ পৃথিবীতে যে শাস্তি দেয়া হয় তার অবস্থা হলো, যখন কোন ব্যক্তি একের পর এক অপরাধ করতে থাকে এবং কোনভাবেই সে তার ভ্রষ্ট ও বিকৃত আচরণ থেকে বিরত হয় না তখন শেষ অবধি তাকে গ্রেফতার করা হয়। যে আদালতে তার মামলার চূড়ান্ত ফায়সালা হবে এবং তার সমস্ত কৃতকর্মের শাস্তি দেয়া হবে তা এ দুনিয়াতে না আখেরাতে কায়েম হবে এবং সেটিই হবে তার ধ্বংসের আসল দিন।

মানুষের শিক্ষার জন্য আল্লাহ এমনসব জাতির দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন যারা আল্লাহর হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মানুষ ও শয়তানের নেতৃত্বে জীবন পথে এগিয়ে চলছে, তারাই আসলে মিথ্যর সাম্রাজ্যে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেছে। তারা মুখ থেকে যে কথাই বের করে বা তারা পৃথিবীতে যে কাজই সংঘটিত করে তা শয়তানের পরামর্শে ও প্ররোচনায়ই করে। তাদের নাকে দড়ি লাগিয়ে শয়তান তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। অবশেষে তারা এমনভাবে বিপথগামী ও বিকারগ্রস্ত হয়ে যায় যার ফলে পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব এক দুঃসহ অভিশাপে পরিণত হয়। কোন ভুখন্ডে বা দেশে এ ধরনের দু’একটি বিপদগামী ও বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি সে দেশের বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট। এদের দুঃসহ জ¦ালা-যন্ত্রণার ফলে আল্লাহর আযাব আসা অবশ্যম্ভাবি হয়ে পড়ে এবং তাদের নাপাক অস্তিত্ব থেকে দুনিয়াকে মুক্ত করা জরুরী হয়ে পড়ে।

যারা সংশোধনের পরিবর্তে গাফলতিতে লিপ্ত ও ভোগের নেশায় মত্ত হয়ে সেচ্ছাচারী জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দেয়া অবকাশ ও সুযোগ হারিয়ে বসে, সত্যের আহ্বায়কের আওয়াজ যাদের অচেতন কানের পর্দায় একটুও সাড়া জাগায় না, তাদের ওপর আল্লাহর নারাজি পতিত হয়। কারো অসৎ কর্মের পেয়ালা যখন পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং তার অবকাশের সীমা শেষ হয়ে যায় তখন অকস্মাৎ এক সময় আল্লাহ তাকে পাকড়াও করেন। আর আল্লাহ একবার কাউকে পাকড়াও করার পর আর তার মুক্তি লাভের কোন পথই খোলা থাকে না। মানব জাতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এক বার দু’বার নয়, শত শত বার, হাজার হাজর বার ঘটে গেছে। এ ক্ষেত্রে মানুষের জন্যে বারবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করার যৌক্তিকতা কোথায়। সচেতন হবার জন্যে কোন বিশেষ সময় নেই যে, সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। যদি কেউ এমনটি করে তাহলে আক্ষেপ করা ও মর্মজ¦ালা ভোগ করা ছাড়া সচেতন হবার আর কোন সুযোগই থাকবে না।

মিথ্যা অরোপকারীদের কিয়ামতে হিসাব-নিকেশ নেয়া হবে। তবে দুনিয়ার জীবনে তাদের ওপর যেসব আযাব আসে সেগুলো তাদের অসৎ কর্মের চূড়ান্ত ফল নয় এবং সেগুলো তাদের অপরাধের পূর্ণ শাস্তিও নয়। বরং দুনিয়ার শাস্তিটা বুঝানোর জন্য উদাহরণ হচ্ছে যে, একজন অপরাধী স্বাধীনভাবে অপরাধ করে বেড়াচ্ছিল, তাকে অকস্মাত গ্রেফতার করে তার আরো বেশী জুলুম, অন্যায় ও ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার সুযোগ ছিনিয়ে নেয়া হলো। মূল শাস্তি তো আদালতে আখেরাতে রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আসলে এর মধ্যে একটি একটি নিশানী আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আখিরাতের আযাবের ভয় করে। তা হবে এমন একটি দিন যেদিন সমস্ত লোক একত্র হবে এবং তারপর সেদিন যা কিছু হবে সবার চোখের সামনে হবে।” (সুরা হুদ : ১০৩)

মিথ্যা আরোপকারীরা শোন! সেদিনটি অবশ্যই আসবে, সেদিন আল্লাহ তা’আলার আদালত কায়েম হবে এবং তিনি স্বয়ং বিচার কার্য সম্পাদন করবেন। আল্লাহ তা’আল বলেন, “এ কথা সুস্পষ্ট, যে ব্যক্তি ডাহা মিথ্যা কথা বানিয়ে আল্লাহর কথা হিসাবে প্রচার করে অথবা আল্লাহর সত্য আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হবে? এ ধরনের লোকেরা নিজেদের তকদীরের লিখন অনুযায়ী তাদের অংশ পেতে থাকবে অবশেষে সেই সময় উপস্থিত হবে যখন আমার পাঠানো ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করার জন্যে তাদের কাছে এসে যাবে। সে সময় তারা (ফেরেশতারা) তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, বলো এখন তোমাদের সেই মাবুদরা কোথায়, যাদেরকে তোমরা ডাকতে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে? তারা বলবে, সবাই অন্তর্হিত হয়ে গেছে এবং তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, বাস্তবিক পক্ষেই তারা সত্য অস্বীকারকারী ছিল। আল্লাহ বলবেন: যাও, তোমরাও সেই জাহান্নামে চলে যাও, যেখানে চলে গেছে তোমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত জিন ও মানবগোষ্ঠী। প্রত্যেকটি দলই নিজের পূর্ববর্তী দলের প্রতি অভিসম্পাত করতে করতে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অবশেষে যখন সবাই সেখানে একত্র হয়ে যাবে তখন পরবর্তী প্রত্যেকটি দল পূর্ববর্তী দলের ব্যাপরে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদের গোমরাহ করেছে, কাজেই এদেরকে আগুনের দ্বিগুণ শাস্তি দাও। জওয়াবে বলা হবে, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ শাস্তিই রয়েছে কিন্তু তোমরা জানো না।” (সুরা আরাফ : ৩৭-৩৮)

যেসব লোকের জন্য ধ্বংস যারা সেদিনের আগমনের খবরকে মিথ্যা বলে মনে করেছিল এবং এ ভেবে পৃথিবীতে পশুর মতো জীবন যাপন করেছে। জমিনে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে চলেছে। মানুষের অধিকার হরণ করে জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। তারা মনে করেছে যে, এমন সময় কখনো আসবে না, যখন প্রভুর সামনে হাজির হয়ে নিজের কাজ-কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এই মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য সেদিন ধ্বংস অপেক্ষা করছে। এদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমি তাদের প্রতি জুলুম করিনি, তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছে আর যখন আল্লাহর হুকুম এসে গেলো তখন আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা নিজেদের যেসব উপাস্যদের ডাকতো তারা তাদের কোন কাজে লাগলো না এবং ধ্বংস ছাড়া তাদের আর কোন উপকার করতে পারলো না।” (সুরা হুদ : ১০১)

মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাব্যতার এ সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে থাকা সত্ত্বেও যারা তা অস্বীকার করছে তারা এ নিয়ে যত ইচ্ছা হাসি-তামাসা ও ঠাট্রা-বিদ্রুপ করুক এবং এর ওপর বিশ্বাস স্থাপনকারী লোকদের তারা যত ইচ্ছা সেকেলে অন্ধবিশ্বাসী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলতে থাক। যেদিনকে এরা মিথ্যা বলছে যখন সেদিনটি আসবে তখন তারা জানতে, সেটিই তাদের ধ্বংসের দিন। অর্থাৎ মহান শক্তিশালী আল্লাহর কুদরত ও কর্মকৌশলের এ বিস্ময়কর নমুনা দেখেও আখিরাতের সম্ভাব্যতা ও যৌক্তিকতা অস্বীকার করছে এবং দুনিয়ার ধ্বংসের পর আল্লাহ তা’আলা আরো একটি দুনিয়া সৃষ্টি করবেন এবং সখানে মানুষের কাছ থেকে তার কাজের হিসেব গ্রহণ করবেন এ বিষয়টিকেও যারা মিথ্যা মনে করেছে, তারা তাদের এ খামখেয়ালীতে মগ্ন থাকতে চাইলে থাকুক। তাদের ধারণা ও বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত এসব কিছু যেদিন বাস্তব হয়ে দেখা দিবে সেদিন তারা বুঝতে পারবে যে, এ বোকামীর মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছেন মাত্র।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “সেদিন ধ্বংস রয়েছে মিথ্যা আরোপকারীদের জন্য। এটি সেদিন যেদিন তারা না কিছু বলবে এবং না তাদেরকে ওযর পেশ করার সুযোগ দেয়া হবে।” (সুরা মুরসালাত : ৩৪-৩৬) এটা হবে তাদের শেষ অবস্থা। এ অবস্থা হবে জাহান্নামে প্রবেশ করার সময়। এর আগে হাশরের ময়দানে তারা অনেক কিছুই বলবে। অনেক ওজর আপত্তি পেশ করবে, একজন আরেকজনের ওপর নিজের কৃত দোষ চাপিয়ে নিজে নিরপরাধ হওয়ার চেষ্টা করবে। যেসব নেতারা তাদেরকে বিপথে পরিচালনা করেছে তাদের গালি দিবে। এমনকি কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানের বক্তব্য অনুসারে অনেকে ঔদ্ধত্যের সাথে নিজের অপরাধ অস্বীকার পর্যন্ত করবে। কিন্তু অত্যন্ত সংগত, যুক্তিযুক্ত পন্থায় ও ন্যায়-ইনসাফের সমস্ত দাবি পূরণ করে তাদেরকে শাস্তির সিদ্ধান্ত শুনানো হবে তখন তারা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যাবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোন ওজর হিসেবে কোন কিছু বলার সুযোগও তাদের জন্য থাকবে না।

লেখক : ব্যাংকার এবং প্রাবন্ধিক।