জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় অর্জন হলেও আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ জনগণের এ ঐতিহাসিক বিজয়কে কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। শুরু থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে রীতিমত বৈরি আচরণ শুরু করে। উদ্ভূত পরিস্তিতিতে বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন, সীমান্ত উত্তেজনা, এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উভয় দেশের সম্পর্ক। সীমান্তে পুশব্যাক বা সন্দেহভাজন অভিবাসীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো, পানিবণ্টন চুক্তি এবং চীন-ভারতের মধ্যকার আঞ্চলিক ভূরাজনীতি দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত অনেকটা লেজেগোবরে অবস্থায় পড়লেও বাংলাদেশে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও বাস্তবতার মুখোমুখি। বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা বলয় নিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর বহুমুখী প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন বাংলাদেশ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ (বিআরআই) প্রকল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের (আইপিএস) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। চীন যেমন বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অংশীদার, তেমনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা, তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত ও বাণিজ্যসহ বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের আগ্রহ বা বাংলাদেশের বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিস্তার অনেক সময় ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব ও মাতারবাড়ী প্রকল্পবঙ্গোপসাগর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হওয়ায় বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নজর এখন এ অঞ্চলে। এমন বাস্তবতায় কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে জাপানের সহায়তায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝে এ বন্দর ও জ্বালানি হাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল সম্ভাবনা আনলেও, তা সুরক্ষার জন্য সূক্ষ্ম কূটনৈতিক দক্ষতা ও প্রজ্ঞার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার সংকট ও রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কেবল আর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আরাকান আর্মির মতো নতুন শক্তির উত্থান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্লু-ইকোনমির জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কূটনীতি ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ কোনো একক পরাশক্তির জোটে ভিড়ে স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বোঝায় পরিণত না হয়ে, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এ নীতির আলোকে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে যেখানে দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যের মাধ্যমে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে পাশ কাটিয়ে নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
একথা ঠিক যে, বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের আধিপত্য নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ও বিপজ্জনক টানাপড়েন শুরু হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (বিসিআইএম-ইসির একটি বর্ধিত অংশ)। চীনের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) আওতাধীন এ করিডোরটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। নয়াদিলীøর এ কৌশলগত বিরোধিতার প্রধান কারণ মূলত ভূরাজনৈতিক আধিপত্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (চিকেনস নেক বা শিলিগুড়ি করিডোর) নিরাপত্তা উদ্বেগ।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সমীকরণে যুক্ত হয়েছে ভারতের নতুন আগ্রাসী কৌশল। করিডোর ঠেকাতে এবং বাংলাদেশকে চাপে রাখতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একই সাথে ভারতের উগ্র-জাতীয়তাবাদী নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের একাংশ থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডোর ও কৌশলগত ভূখণ্ড বিশেষ করে ‘রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগ’ সামরিকভাবে দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি ও উসকানি দেয়া হচ্ছে। এ নতুন আগ্রাসনের মুখে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এখন এক ঐতিহাসিক সঙ্কটের মুখোমুখি। যা একেবারে উপেক্ষা করার সুুযোগ নেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন তৎপরতা ও সাইবার নজরদারি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে তার আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। চট্টগ্রাম একটি ভূরাজনৈতিক ‘হটস্পটে’ পরিণত হলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা বলয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাই এ বিষয়ে অতি সন্তর্পণে ও সাহসিকতার সাথে অগ্রসর হতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বিসিআইএমইসি কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয় বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবকে খর্ব করার একটি চীনা কৌশল বলে মনে করে নয়াদিলীø। ভারত আশঙ্কা করে, এ করিডোরের মাধ্যমে চীন ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার যে নীতি (স্ট্রিং অব পার্লস) নিয়েছে, তা পূর্ণতা পাবে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে চীনের পরোক্ষ উপস্থিতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। যা সাউথ ব্লককে রীতিমত উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক অভিজ্ঞমহল।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী সংকীর্ণ অংশটি ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। বলা হচ্ছে-চীন যদি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ওপর এ করিডোরের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে যুদ্ধকালীন বা ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের সময় ভারতের এ জীবনরেখা ঝুঁকিতে পড়বে। আর এটিই বাস্তবতা।
বিষয়টিকে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত তাদের জন্য নিরাপত্তা হুমকী মনে করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য দেশটি নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করছে। সে ধারাবাহিকতায় দেশটি এ করিডোর ও ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে ভারত তার ‘পুশইন’ নীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সীমান্ত এলাকায় জোরপূর্বক পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে দেশটির পক্ষ থেকে। এর চেয়েও বিপজ্জনক বিষয় হলো, ভারতের চরমপন্থী থিংক-ট্যাংক ও সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অজুহাতে বাংলাদেশের ‘রংপুর বিভাগ’ এবং বঙ্গোপসাগরে ভারতের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ও চীনা করিডোর রুখে দিতে ‘চট্টগ্রাম বিভাগ’ দখলের মতো আগ্রাসী ও উসকানিমূলক হুমকি দিচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং একটি চরম ভূরাজনৈতিক উসকানি বলেই মনে করছেন বোদ্ধামহল।
সাউথ ব্লব ও ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য অনুসারে এ অর্থনৈতিক করিডোর চালু হলে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পাবে। এর ফলে ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের নিয়মিত টহল বৃদ্ধি পাবে, যা ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বলয়কে দুর্বল করবে। ঢাকার চীনা দূতাবাস সূত্র এ ধরনের বিষয়কে কল্পনা প্রসূত বলে মনে করে। তবে অর্থনৈতিকভাবে এ করিডোর চীনের জন্য অত্যন্ত লাভজনক এতে কোন সন্দেহ নেই। চীনের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য ইউনান থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে পণ্য পরিবহনের পথ উন্মুক্ত হবে। এতে মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। যা দেশটির অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তুলবে। একই সাথে আঞ্চলিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
একথা ঠিক যে, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। মিয়ানমারে জান্তা সরকারের ওপর চীনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ফলে এ করিডোর বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে ব্যবহার করা চীনের জন্য সহজ। তবে বাংলাদেশের জন্য সমীকরণটি বেশ জটিল। বাংলাদেশ এক দিকে চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন চায়, অন্যদিকে ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের কৌশলগত রাজনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতা রয়েছে। এর সাথে নতুন করে এখন সীমান্ত হুমকি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাই উভয় পক্ষকে সমন্বয় করে চলা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সহজসাধ্য নয়।
প্রস্তাবিত এ করিডোরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। ভারতের দখলদারিত্বের প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ-এ দু’য়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে পারে চট্টগ্রামের সামগ্রিক নিরাপত্তা। অর্থনৈতিক করিডোর হলে চট্টগ্রাম বন্দর এবং কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রধান নৌঘাঁটিগুলোর খুব কাছাকাছি চীনা বাণিজ্যিক ও কারিগরি কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে। কারো কারো ধারণা-এর ফলে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর গোপনীয়তা ও কৌশলগত অবস্থান যেমন নজরদারির আওতায় চলে আসার ঝুঁকি থাকে, ঠিক তেমনি ভারতের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন বা গোয়েন্দা নাশকতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এ অঞ্চল।
একসময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের আগ্রহ ছিল, যা ভারতের আপত্তির কারণে বাতিল হয়। বর্তমানে মাতারবাড়িতে জাপানের সহযোগিতায় গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বিভিন্ন পরাশক্তির (চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র) অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের এই সঙ্ঘাত যেকোনো সময় আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান জাতিগত সঙ্ঘাত এবং আরাকান আর্মির তৎপরতা এ করিডোরের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। করিডোরকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নতুন করে অস্ত্র চোরাচালান, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের মতো নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো ঘনীভূত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পুশইন ও ভূখণ্ড দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং চীনের করিডোর রাজনীতির মধ্যে চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। উত্তর সীমান্ত (রংপুর) এবং উপকূলীয় অঞ্চলে (চট্টগ্রাম) বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করতে হবে, যেন কোনো বিদেশী শক্তি এখানে কোনো ধরনের দুঃসাহস দেখানোর সুযোগ যেন না পায়।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সুযোগ হতে পারত। কিন্তু ভারতের পুশইন নীতি এবং রংপুর ও চট্টগ্রাম দখলের উসকানিমূলক হুমকির পর এ সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এটি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক করিডোর নয়, এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই। ভারতের তীব্র আপত্তি এবং চট্টগ্রামের সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে, বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর এ ছায়াচ্ছন্ন ও আগ্রাসী যুদ্ধে রংপুর বা চট্টগ্রাম যেন কোনোভাবেই বলির পাঁঠা না হয়, সেটাই এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে, এ অর্থনৈতিক করিডোরকে ঘিরে ভারতের আগ্রাসী নীতির পাশাপাশি বর্তমান ভূরাজনীতিতে আরো দু’টি অত্যন্ত প্রভাবশালী উপাদান যুক্ত হয়েছে। একটি হলো দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সঙ্কট ও মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং অন্যটি হলো চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ (আইপিএস)। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ মধ্যকার তীব্র সঙ্ঘাত প্রস্তাবিত এ করিডোরের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব হুমকি। অবশ্য এ অঞ্চলে সহাবস্থান নিয়ে চীন আমেরিকার মধ্যে কোন কৌশলগত বোঝাপড়া হলে এ সমীকরণ পাল্টে যাবে। তেমন সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে নানা সূত্র থেকে।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, রাখাইন রাজ্যের একটি বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। চীন তার করিডোরের নিরাপত্তার স্বার্থে এক দিকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির সাথেও গোপন সমঝোতা বজায় রাখছে বলে ধারণা করা হয়। চীন এ করিডোর নির্বিঘ্ন করতে মাঝেমধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা নেয়ার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে তারা রাখাইনে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চাইলে চীনের প্রভাবাধীন এ করিডোরের বাস্তবায়নে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একসময় বঙ্গোপসাগরে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রযাত্রাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি মনে করত। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়াড’ জোট বঙ্গোপসাগরে চীনা করিডোরের তীব্র বিরোধিতা করে। ওয়াশিংটন এ ক্ষেত্রে ভারতকে ফ্রন্টলাইনে রাখায় নয়াদিল্লি আরো বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যেন চীন এ করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার না পায়। কিন্তু সে সমীকরণ ভারত রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে থাকায় আর কাজ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস হারায় নয়াদিল্লির ওপর। এর ফলে কোয়াড নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ শেষ হয়ে যায়। ভারতকে বাদ দিয়ে এ অঞ্চলে নতুন সমীকরণ সাজাতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিং সফরে যান। এ সফরকালে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে এ অঞ্চল নিয়ে নতুন সমঝোতার কথা শোনা যায় যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দিল্লি কৌশলগত গুরুত্ব হারায়। এরপর বেপরোয়া হয়ে চিকেন নেকের চার পাশে সামরিক স্থাপনা তৈরি এবং ভারতের রংপুর বা চট্টগ্রাম দখলের হুমকি সামনে আনা হয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যা বাংলাদেশের জন্য বেশ মাথাব্যথার কারণ।
মূলত, ভারতের পুশইন ও ভূখণ্ডগত হুমকি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। বাংলাদেশ যদি বড় শক্তিগুলোর কার্যকর সহায়তা না পায় তাহলে এর সুযোগ নিয়ে ভারত অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে। এ চাপে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই বড় শক্তির আস্থা বজায় রাখা দরকার ঢাকার। রংপুর ও চট্টগ্রামসহ সামগ্রিক সীমান্ত ও স্থলভাগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে এখন ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এ গৎবাঁধা নীতির চেয়েও একধাপ এগিয়ে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘দৃঢ় সামরিক প্রতিরোধ নীতি’ বজায় রাখতে হবে। কোনো দেশের হুমকিতে পা না দিয়ে বা কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশের একমাত্র লক্ষ্য। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি আত্ম বলে বলীয়ান হওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আবেগ নির্ভর না হয়ে বাস্তববাদী হতে হবে। প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে শত্রুমিত্র চিহ্নিত করে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। কারো সাথে বৈরিতা নয় কিন্তু যারা আসলে বৈরি তাদেরকে বন্ধু মনে করা হবে সবচেয়ে বড় ভুল। আমাদেরকে একথাও মনে রাখতে হবে যে, কোন শক্তি এসে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পাহারা দেবে না বরং আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে দেশের অখণ্ডতা সার্বভৌমত্ব। www.syedmasud.com