প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর
অধ্যাপক ড. আবদুল গফুর গাজী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল, আঞ্চলিক ভারসাম্যনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার একটি সুস্পষ্ট উদ্যোগ। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর, যেখানে মালয়েশিয়ার পাশাপাশি চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের বাস্তবভিত্তিক, উন্নয়নমুখী এবং বিনিয়োগনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী দেশ, শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো খাতে অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত বিষয়। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট সতেরোটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর। এসব সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। যদিও সমঝোতা স্মারক সরাসরি বাস্তব প্রকল্প বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কাঠামো তৈরি করে, যা ধাপে ধাপে বাস্তব উন্নয়ন প্রকল্পে রূপ নিতে পারে।
এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক ছিল দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা। বাংলাদেশ চীনের বিশাল বাজারে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, পাশাপাশি চামড়া, হিমায়িত মাছ, ওষুধ এবং হালকা শিল্পজাত পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। যদি এসব পণ্যের ক্ষেত্রে চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বাস্তবে সম্প্রসারিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
অবকাঠামো খাতেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি নতুন কিছু কৌশলগত প্রকল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেছে। বিশেষ করে শিল্পায়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ইস্যুও আলোচনায় উঠে এসেছে, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দীর্ঘদিনের বিষয়। যদিও এই বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে আলোচনার অগ্রগতি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত রেখেছে।
এই সফরের কূটনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার জটিল সমীকরণ বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হয়, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রেখে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ও নীতিগত ভারসাম্যও বজায় রেখেছে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, যৌথ বিবৃতি এবং সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্র বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে যে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে বাস্তবতার দিকটি উপেক্ষা করা যায় না। অতীতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও সব প্রকল্প নির্ধারিত সময় বা কাক্সিক্ষত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এবারের সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই ঘোষণাগুলোর বাস্তব রূপায়নের ওপর। বিশেষ করে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনই হবে প্রকৃত সাফল্যের প্রধান মানদ-।
এই সফরের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎমুখী খাতে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ জ্বালানি, স্মার্ট অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তির মতো খাতে সহযোগিতা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন এসব খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। চীন-ভিত্তিক বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে সেই সংযোগ আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি দেখিয়েছে যে বাংলাদেশ এখন পররাষ্ট্রনীতিকে কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার একটি সমন্বিত কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিতে চায়।
শেষ পর্যন্ত এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি সমঝোতা স্মারকগুলো কার্যকর প্রকল্পে রূপ নেয়, বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেও আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করবে। আর যদি বাস্তবায়ন দুর্বল থাকে, তবে এটি একটি সম্ভাবনাময় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
তবুও এটি স্পষ্ট যে, এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে যেখানে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব একসঙ্গে একটি সুসংগঠিত ও ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।