গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়; বরং এটিই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। ভিন্নমত, বিতর্ক, সমালোচনা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা- এসবের মধ্য দিয়েই একটি সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক মতবিরোধের সমাধান যুক্তি, আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংগঠিত জনতার শক্তি, ভয়ভীতি, হামলা, অবরোধ কিংবা বিচারবহির্ভূত চাপের মাধ্যমে করার চেষ্টা হয়, তখন সেই প্রবণতাই “মব কালচার” নামে পরিচিত। এটি কোনো একটি দল, মত বা আদর্শের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আইন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক স্বাধীনতার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জনতার আবেগকে ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল- দেশ এমন এক পথে এগোবে, যেখানে মতবিরোধের নিষ্পত্তি হবে আদালতে, প্রশাসনের মাধ্যমে এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে; জনতার বিচারের মাধ্যমে নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়া এবং যশোরে সংঘটিত দুটি পৃথক ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সাঁথিয়ায় একটি মসজিদে জুমার নামাযকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেছেন যে তার ওপর এবং তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে যশোরে সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুরের চেষ্টা এবং তার পরিবারকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তার চিকিৎসাধীন মানসিক রোগে আক্রান্ত কন্যাকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও পরে তা জনতার বিক্ষোভে রূপ নেয়, যা সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা ইন্ধন দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ দুটি ঘটনার প্রকৃত সত্য কী, কারা দায়ী এবং অভিযোগ কতটা সঠিক- এসব বিষয় নির্ধারণ করবে আইনানুগ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া। কোনো পক্ষের বক্তব্যই আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু একটি বিষয় নিঃসন্দেহে বলা যায়-কোনো অভিযোগ, ক্ষোভ কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান জনতার হামলা, অবরোধ বা ভাঙচুরের মাধ্যমে হতে পারে না। কারণ আইনের শাসনের পরিবর্তে যদি জনতার শক্তি বিচার নির্ধারণ করতে শুরু করে, তাহলে সেখানে নাগরিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব-সবই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ দুটি ঘটনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। একজন সংসদ সদস্য কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংবিধানিক প্রতিনিধি। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যদি কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মসজিদে কিংবা নিজ বাসভবনে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা সম্পর্কে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তি পরিমাপ হয় কেবল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিয়ে নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মাধ্যমে।
মব কালচারের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এটি ধীরে ধীরে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বিচার আদালতে নয়, জনতার চাপে হবে; তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা দলীয় আবেগ মুহূর্তের মধ্যে একটি ছোট ঘটনাকে বড় সংঘাতে রূপ দিতে পারে। এতে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ইতিহাস বলে, একবার যদি জনতার বিচার সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে এর শিকার শেষ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দল, সব মতাদর্শ এবং সাধারণ নাগরিকও হন।
এ প্রেক্ষাপটে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, কর্মসূচিতে বাধা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগও মব কালচার নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। কোনো রাজনৈতিক মতভেদের কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব হলো নিজেদের কর্মীদের সংযত রাখা এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা না দেওয়া। গণতন্ত্রে মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু সেই মতবিরোধের সমাধান হতে হবে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
ইসলামের দৃষ্টিতেও এ ধরনের প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম ন্যায়বিচার, সংযম ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে উদ্বুদ্ধ না করে। ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮)। এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রতিপক্ষের প্রতি বিরাগ কিংবা রাজনৈতিক মতভেদ কখনো ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না। অন্যায়ের প্রতিবাদও হতে হবে ন্যায়ের সীমার মধ্যে থেকে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও আমরা একই শিক্ষা পাই। তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রমাণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইসলাম কোনো অবস্থাতেই জনতার আবেগকে আইনের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায় প্রতিরোধে ধৈর্য, সংলাপ এবং সুবিচারের ওপর জোর দেয়।
মব কালচার কেবল রাজনৈতিক সহিংসতা সৃষ্টি করে না; এটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি দেশে যদি বিনিয়োগকারী মনে করেন যে আইন প্রয়োগের পরিবর্তে জনতার চাপই শেষ কথা, তাহলে সেই দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নেতা-কর্মীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে- রাজনৈতিক বিরোধিতা করা গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতবিরোধ থাকলে তা আদালত, নির্বাচন, সংসদ, সংবাদমাধ্যম কিংবা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা উচিত, শত্রু হিসেবে নয়।
প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যদি কোনো জনপ্রতিনিধি বা নাগরিকের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের অন্যতম প্রধান শর্ত। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কিংবা নিষ্ক্রিয়তা জনমনে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি। যাচাই-বাছাই ছাড়া ভিডিও, ছবি বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সময় উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ-সবারই উচিত তথ্য যাচাই করে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া। কারণ তথ্যযুদ্ধের এই যুগে একটি মিথ্যা খবরও বাস্তব সহিংসতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নাগরিক সমাজ, আলেম-উলামা, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা যদি সমাজে সংলাপ, সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার যেকোনো ঘটনার ভিডিও, ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা উচিত। এতে বিচারিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে এবং বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধের প্রবণতা কমবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। এ সময়ে মব কালচারের পুনরুত্থান কেবল আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়; গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও বড় হুমকি। তাই সাঁথিয়া ও যশোরের ঘটনাকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা-রাষ্ট্র যদি আইনের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দুর্বল হতে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা।
গণতন্ত্রের শক্তি জনতার আবেগে নয়, আইনের শাসনে; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার ক্ষমতায় নয়, ভিন্নমতকে নিরাপদভাবে প্রকাশের সুযোগে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে শেষ কথা বলে আদালত, সংবিধান এবং আইন-কোনো উচ্ছ্বসিত জনতা নয়। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়তে চায়, তবে সব রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে মব কালচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কারণ আজ যে অন্যের বিরুদ্ধে জনতার বিচারকে সমর্থন করে, কাল সেই বিচারই তার নিজের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। আর তাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং নাগরিক অধিকারের নিরাপত্তার স্বার্থেই আমাদের প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে হবেÑ বাংলাদেশে ব্যক্তি বা জনতা নয়, শেষ কথা বলবে আইন।