প্রাণী থেকে মানুষকে আলাদা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো নৈতিক মূল্যবোধ। অথচ এই বোধের বিলয় ঘটছে বর্তমান সভ্যতায়। পিছিয়েপড়া দরিদ্র দেশগুলো নয়, বরং দাম্ভিক বড় বড় দেশের বড় বড় নেতাদের স্কন্ধেই এর দায় বর্তায়। ট্রাম্প, নেতানিয়াহুর সেই ক্লাবে এখন যুক্ত হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। এক সময় বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতকে নীতিনিষ্ঠ থাকতে দেখেছি। নৈতিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে কোনো জোটের বরকন্দাজ হতে চায়নি, বরং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা ছিল ভারত। অথচ সেই ভারতের আজ এ কেমন চিত্র! গাজায় গণহত্যায় ইসরাইলকে অস্ত্র দিচ্ছে ভারত। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয, গাজায় চলমান গণহত্যায় ইসরাইলকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে ভারত। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, এসব অস্ত্র ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, তবুও ভারত সরবরাহ বন্ধ করেনি। অ্যামনেস্টির প্রতিবদেনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারত থেকে ইসরাইলে পাঠানো ২৫৯৬টি অস্ত্র, গোলাবরুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জামের চালান বিশ্লেষণ করেছে তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কোম্পানিগুলো ইসরাইলের সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে অন্তত ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক অস্ত্রের উপাদান যার মধ্যে ড্রোনের ওয়ারহেড ও আর্টিলারি সেলের খোল রয়েছে। এছাড়া ২৯৮টি সামরিক যানবাহনের উপাদান সরবরাহ করেছে ভারত। অ্যামনেস্টি জানায়, বাণিজ্যিক চালানের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে এসব পণ্য ইসরাইলের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে। যেগুলো পরে দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করা হয়। যা দিয়ে গাজায় চালানো হয় গণহত্যা।
উল্লেখ্য, আল-জাজিরাও ভারতের কাস্টমসের ৯১টি রপ্তানি নথি সংগ্রহ করে, যেখানে ২০২৪ সালের ইসরাইলে বোমা ও গ্রেনেড সংক্রান্ত যন্ত্রাংশ রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়। এসব চালানের ক্রেতাদের মধ্যে ছিল ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রাফায়েল এডভান্স ডিফেন্স সিস্টেমস, আইএমআই সিস্টেমস লিমিটেড ও এম সিটি মেটারিয়ালস। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, গাজায় কি ঘটছে তা বিশ্ব প্রতিদিন দেখছে। এরপরও ভারত ইসরাইলের সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারত শুধু অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণেই ব্যর্থ নয়, বরং ইসরাইলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করেছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গাজায় সম্ভাব্য গণহত্যা ঠেকাতে ইসরাইলকে ব্যবস্থা নেওয়ার অন্তবর্তী আদেশ দেন। এরপর থেকে জাতিসংঘের একাধিক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।
এদিকে Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI) জানায়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরাইলের মোট অস্ত্র রপ্তানির ২৯ শতাংশই গেছে ভারতে, যা দেশটিকে ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা ক্রেতায় পরিণত করেছে। একই সময়ে ভারতের অস্ত্র আমদানির ১৫ শতাংশ এসেছে ইসরাইল থেকে। ২০২৫ সালের নবেম্বরে দুইদেশ নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে সামরিক, শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গণতান্ত্রিক দেশ ভারত কোন দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার করছে? যে দেশ যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত, যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ওপর জারি আছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা-তেমন একটি দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার এবং অস্ত্র সরবরাহের ঘটনা কতটা সঙ্গত? গাজায় ইসরাইল কি করছে তা কি ভারত জানে না? তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্র যে গোজায় গণহত্যায় ব্যবহার করা হবে তা কি মোদি সরকার জানে না? ভালোভাবে জানার পরও যখন ভারত ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তখনতো নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। মানুষ তার নৈতিক মুল্যবোধ বিসর্জন দিলে, হিংস্র প্রাণীর সাথে আর কোনো পার্থক্য থাকে কী? অবয়বের এমন মানুষ দিয়ে কাতি দেশ, বিশ্ব ও সভ্যতা গড়া সম্ভব নয়, এটাইতো বর্তমান সময়ের বাস্তবতা।