আসিফ আরসালান

ইংরেজি Flurry. Flurry-এর বাংলা আভিধানিক অর্থ হলো দমকা হাওয়া, আকস্মিক প্রবাহ বা হুলুস্থুল ব্যাপার। এক বা একাধিক দেশের মধ্যে যখন অকস্মাৎ কূটনৈতিক তৎপরতা অস্বাভাবিক বেড়ে যায় তখন সেটিকে বলা হয় Flurry of diplomatic activities. গত ৫ অগাস্ট দিলীøর বৈদেশিক সংবাদদাতাদের ক্লাবে শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের অবনতিশীল সম্পর্ক আরেক দফা হোঁচট খায়। শেখ হাসিনার ঐ সংবাদ সম্মেলনের পর পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি ইস্যু করে সেটি ভাষার দিক দিয়ে এতই কঠোর ছিলো যে, কূটনীতির পরিভাষা সেটিকে কভার করে না। শেখ হাসিনাকে Convicted genocidal murderer, আওয়ামী লীগকে মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ বা মাফিয়া সংগঠন এবং ভারত যে এমন খুনিকে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দিয়েছে সেটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা (Affront to the sovereignty of Bangladesh) বলা হয়েছে। এর পরেই শুরু হয় কূটনৈতিক অঙ্গনে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দৌড়ঝাঁপ।

৯ অগাস্ট দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে দেখা করেন। এ বৈঠকে তিনি বাংলা ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পরদিন অর্থাৎ ১০ অগাস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দেখা করেন। উল্লেখ্য প্রায় ২ মাস হলো ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশে এসে তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ২ মাস পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করলেন।

দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের একজন বর্ষীয়ান নাগরিক ও রাজনীতিবিদ। তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় একজন মন্ত্রী ছিলেন। ড. ইউনূসের ইন্টারিম সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একেবারে তলানীতে ঠেকেছিলো। এর জন্য প্রধানত ভারতই দায়ী। তারা দাম্ভিকভাবে বলেছিলো যে তারা কোনো অনির্বাচিত সরকার নয়, নির্বাচিত সরকারের সাথেই সম্পর্ক করবে।

বাংলাদেশের গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা চালায়। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তিকালের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের কাছে শোক বার্তা পাঠান। এ শোক বার্তাটি নিয়ে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জয়শঙ্কর। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করার দিন ভারতীয় লোক সভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় আসেন। তিনি সাথে করে ভারত সফরের জন্য তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদির দাওয়াতপত্র নিয়ে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়া হয়নি।

ভারত চেয়েছিলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সর্বপ্রথম ভারত সফরে যান। কিন্তু তারেক রহমান তার প্রথম সফর হিসাবে চীনকেই বেছে নেন (বাস্তবে প্রথমে যান মালয়েশিয়া)। এরপর আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এ আমন্ত্রণটি পাঠানো হয়েছিলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসাবে। এ দাওয়াতটি সরকার কবুল করেননি, এমন অফিসিয়াল বার্তা না থাকলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসাবে ব্রিকস সম্মেলেনের আউটরিচে অংশগ্রহণের প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এ তীব্র টানাপোড়েনের পটভূমিতে শেখ হাসিনা দিলীøতে ঐ সংবাদ সম্মেলন করেন। এই সংবাদ সম্মেলন যাতে অনুষ্ঠিত না হয় তার জন্য পূর্বাহ্নেই বাংলাদেশ সরকার ভারতকে অনুরোধ করে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সে অনুরোধে কর্ণপাত করেনি। এরপর ইস্যু করা হয় সে বহুল আলোচিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি। এটিকে বলা যেতে পারে Hard hitting statement.

এ বিবৃতির পরেই ভারতের টনক নড়ে এবং শুরু হয় Flurry of diplomatic activities. ৯ অগাস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে দেখা করেন। পরদিন ১০ অগাস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দেখা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের এ বৈঠক ভারতের জন্য মোটেই সুখকর হয়নি। এ বৈঠকে বাংলাদেশের তরফ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পন চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের নিকট হস্তান্তর করার দাবি জানানো হয়। আরো দাবি জানানো হয় যে, ‘ইনকিলাব মঞ্চে’র প্রধান শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকারীদেরকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। তাদেরকেও বাংলাদেশের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হোক। বাংলাদেশে যেসব ব্যক্তিকে হাইকমিশনার করে ভারত পাঠায় তাদের সর্বোচ্চ পদমর্যাদা ছিলো সচিব। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসাবে পাঠানো হয়। এমন সিনিয়র একজন ব্যক্তি ১০ তারিখের বৈঠকের পর বুঝতে পারেন যে, দু’দেশের সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এ পরিস্থিতি ভারতের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানানো এবং পরবর্তী দিক নির্দেশনা গ্রহণের জন্য ১০ অগাস্টেই ত্রিবেদী বিমান যোগে দিলীø যান। ১১ অগাস্ট দীনেশ ত্রিবেদী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক করেন। ১২ অগাস্ট দিলীøর সাউথ ব্লকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। ১৪ অগাস্ট তার ঢাকা ফেরার কথা।

দীনেশ ত্রিবেদীর এ যে ঢাকা দিল্লী দৌড়ঝাঁপ এবং দিলীø পৌঁছার পরদিনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, এর সবকিছুর মূলেই যে ছিলো বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের উন্নতি করা সেটা ভারতের প্রধান গণমাধ্যমসমূহের রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায়। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ রিপোর্ট মোতাবেক ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর মোদির কাছে গিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে enduring সম্পর্কের জন্য guidance চেয়েছেন। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়ায়’ বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ত্রিবেদীর নিয়োগকে ঢাকা-দিলীø সম্পর্ক reset/repair করার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। তাদের সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে নতুন অধ্যায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এমনকি তিস্তা পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনার কথাও এসেছে। ‘হিন্দুস্তান টাইমসে’র মতে, ত্রিবেদীর ঢাকা বৈঠককে সম্পর্কের অবস্থা পর্যালোচনা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার অংশ হিসেবে এসেছে। এরপরই তার দিল্লী যাত্রার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ‘এনডিটিভি’ বৈঠককে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ত্রিবেদী মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এসব পত্র-পত্রিকা ছাড়াও ইন্ডিয়া টুডে, দি প্রিন্ট, ট্রিবিউন ইন্ডিয়া, ডেকান হেরাল্ড, নিউজ ১৮ প্রভৃতি গণমাধ্যমে মোদি-ত্রিবেদী বৈঠকে শেখ হাসিনার ইস্যুটি প্রাধান্য পেয়েছে বলে বলা হয়েছে। NDTV এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ত্রিবেদী ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সামলানো এবং ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার জন্য মোদির কাছ থেকে কৌশলগত নির্দেশনা চেয়েছেন। তারা এটিকে সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে না দেখে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে দৈনিক সংগ্রামে গত ১৩ অগাস্ট প্রথম পৃষ্ঠায় যে লীড নিউজ প্রকাশিত হয়েছে তার শিরোনাম, “দিল্লী সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান/ ঢাকা দিল্লী কূটনৈতিক সম্পর্কে নজিরবিহীন মোড়”। খবরের এক স্থানে বলা হয়েছে, “ভারত সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেয়ার জন্য। এরই অংশ হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলে উপযুক্ত সময়ে দিলীø সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লীকে দেওয়া বার্তার শর্ত অনুযায়ী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাদে শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকারী ও অন্যান্য অপরাধীদের ফেরত দিতে পারে ভারত। এছাড়াও ঢাকার কড়াবার্তা অনুযায়ী পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে আর দিল্লীতে বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দেয়ার সুযোগ ভারত দিবে না বলে এমন মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারে নয়া দিলীø। আরও অন্যান্য অমীমাংসিত বিষযগুলো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।”

একই বিষয়ে একই তারিখে অর্থাৎ ১৩ অগাস্ট দৈনিক কালবেলার প্রথম খবরের শিরোনাম, “দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাচ্ছেন তারেক রহমান/সফর হতে পারে চলতি মাসেই”। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “নানা জল্পনা-কল্পনার মাঝেই শিগগির ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা-দিলীøর কূটনৈতিক সূত্রগুলো কালবেলাকে বলছে, দুদেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক, স্থিতিশীল ও জনকেন্দ্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই হবে দ্বিপক্ষীয় এ সফরের লক্ষ্য। আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লীতে হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনের আগেই এ সফর সম্পন্ন হতে পারে। এমনকি তারেক রহমান দিল্লী যেতে পারেন চলতি মাসেই। আর ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজে অংশ না নিয়ে পাঠাতে পারেন প্রতিনিধি।”

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে আগামী ২০ অগাস্ট দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সরকার এব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাচ্ছেন না বলে মোটামুটি ধরে নেয়া যায়। চীন সফরের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেদিকে যাচ্ছিলো সে গতি পথে কোনো ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিনা সেটি দেখার জন্য পর্যবেক্ষক মহল সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। হাসিনা এবং ওসমান হাদীর ইস্যু তো রয়েছেই। আরো রয়েছে তিস্তার পানি বন্টন এবং ডিসেম্বরে শেষ হওয়া গঙ্গা নদীর পানি বন্টন সম্পর্কে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি শেষ হওয়ায় সেটি নবায়ন করা হবে কিনা অথবা এই পানি বন্টন সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা হবে কিনা, সেগুলোও বাংলাদেশের জন্য জ¦লন্ত ইস্যু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সময় এসব ইস্যু অবশ্যই উত্থাপিত হবে। তার ওপরেই নির্ভর করবে আগামী দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কোন পথে যাবে।

Email:[email protected]