গাজী সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী:

ট্রাম্প বুক ফুলিয়ে দাবি করেছেন ইরানের আটকে রাখা সমস্ত সম্পদের ওপর এখন আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইরান যদি সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার ইশারায় না নাচে, তবে এই সম্পদ তারা কখনোই ছাড়বে না।

  • কিন্তু আমেরিকার এমন গায়ের জোর খাটানোর আগ্রাসী নীতির কারণে খোদ তাদের নিজেদের ওপর কী ধরণের ঝুঁকি ধেয়ে আসছে তা কল্পনার বাইরে।
  • গত ১৫ বছরে লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা, ইরান, সিরিয়া এবং রাশিয়ার মতো একের পর এক দেশের সম্পদ অবরুদ্ধ করে রেখেছে আমেরিকা।
  • ২০২২ সালে রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলারের রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ আটকে দেওয়া ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা, যা বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

মার্কিনীদের এই নোংরা চাল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দুটি বড় পরিবর্তনকে আরও দ্রুততর করেছে:

১.বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিদেশে রাখা তাদের নিজেদের রিজার্ভের সোনা সশরীরে দেশে ফিরিয়ে আনা শুরু করেছে।

২.আমেরিকান ডলার এবং বন্ডের ওপর থেকে ভরসা কমিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন সোনার মজুদ বাড়ানোর ধুম পড়েছে।

নিজ দেশে সম্পদ ফিরিয়ে আনার হিড়িক:

ভারত:

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (আরবিআই) গত মার্চের শেষ নাগাদ তাদের প্রায় ৬৮০ টন সোনা -যা তাদের মোট রিজার্ভের প্রায় ৭৭ শতাংশ -ইতিমধ্যেই দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

সার্বিয়া:

সার্বিয়ার ন্যাশনাল ব্যাংক এখন তাদের ৫৩ টনেরও বেশি সোনার প্রায় পুরোটাই বেলগ্রেডে নিজেদের মাটিতে এনে জমা রেখেছে।

ফ্রান্স:

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্কিন হেফাজত থেকে এক ধাক্কায় ১২৯ টন সোনা নিজেদের দেশে ফেরত নিয়ে এসেছে।

জার্মানি:

আমেরিকার মাটিতে গচ্ছিত রাখা জার্মানির প্রায় ১,২৩৬ টন সোনা অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এখন সে দেশের বুন্দেসব্যাংকের ওপর চাপ বাড়ছে।

এই ছিল কিছু নমুনা।

অন্যদিকে মার্কিন ডলারের বদলে সোনার ওপর ভরসা বেড়েই চলেছে।

রাশিয়ার সম্পদ আটকে দেওয়ার এক বছর পর ‘ইনভেসকো’র করা একটি জরিপে দেখা গেছে:

বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, আমেরিকার এই বেইমানির পর গোল্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় সম্পদ হয়ে উঠেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ২০২৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে:

৭৩ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট মনে করে যে, আগামী পাঁচ বছরে বৈশ্বিক রিজার্ভে মার্কিন ডলারের আধিপত্য মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

আর ৪৩ শতাংশ ব্যাংক আগামী ১২ মাসের মধ্যে তাদের সোনার মজুদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

শুধু মুখের কথা না, বাস্তবেও বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালেই রেকর্ড ৮৬৩ টন সোনা কিনেছে এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই কিনে ফেলেছে আরও ২৪৪ টন সোনা -যা আগের কোয়ার্টারের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে ব্রিকস প্লাস (BRICS+) জোটের সোনার পাহাড় এবং মার্কিন সম্পদ বর্জন বিষয়টাও চোখ কপালে তোলার মত:

ইবিসি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিকস প্লাস ভুক্ত দেশগুলোর হাতে এখন ৬,০০০ টনেরও বেশি সোনা রয়েছে -যা বিশ্বের মোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের প্রায় ১৭.৪ শতাংশ; অথচ ২০১৯ সালেও এটা ছিল মাত্র ১১.২ শতাংশ।

২০২০ থেকে ২০২৫ সালের শেষের দিকের মধ্যে ব্রিকস দেশগুলো তাদের মোট আন্তর্জাতিক রিজার্ভে সোনার পরিমাণ ১০২ শতাংশ বাড়িয়েছে

২০২৬ সালের মার্চের হিসাব অনুযায়ী, চীনের কাছে এখন প্রায় ২,৩১৩ টন, রাশিয়ার কাছে ২,৩০৪ টন এবং ভারতের কাছে ৮৮০ টন সোনা মজুত রয়েছে।

এদিকে চীন মার্কিন বন্ড বা ট্রেজারি বিলের ওপর তাদের বিনিয়োগ আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে:

২০১৩ সালে যেখানে চীনের কাছে ১.৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন বন্ড ছিল, ২০২৬ সালের শুরুতে তা কমিয়ে মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ হাজার কোটি ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।

অর্থাৎ, চীন এক ধাক্কায় তাদের মার্কিন বন্ডের প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ বা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এর বাইরেও ব্রিকস প্লাসভুক্ত দেশগুলো এখন মার্কিনীদের তৈরি ‘সুইফট’ (SWIFT) পেমেন্ট সিস্টেমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রা এবং বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের এই হঠকারী দাদাগিরি মূলত মার্কিন ডলারের কবর নিজেই খুঁড়ে দিচ্ছে।

#Reserve