যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন। মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডস। এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের এই জরিমানার পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে একই মামলায় মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। নতুন করে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় মামলাটিতে প্রতিষ্ঠানটির মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার সমান।
প্রয়োজনে এটিকে আরও টিভি নিউজ বা অনলাইন পোর্টালের স্টাইলে সাজিয়ে দিন।
বিচারক ব্রায়ান বিয়েডশেইড মেটাকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করে এর বিজ্ঞাপন ও কন্টেন্টকে ‘পণ্য’ এবং শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি ও যৌন শোষণকে ‘বিষাক্ত দূষণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একে তিনি ‘জনদুর্ভোগ’ বা জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সংকট বলে অভিহিত করেছেন।
বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, মেটার সুপারিশমূলক অ্যালগরিদমগুলো কমবয়সী ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কন্টেন্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগের দিকে ধাবিত করছে। শিশুদের ওপর প্ল্যাটফর্মগুলোর এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল ইন্টারনেটের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, পরিবার, বিদ্যালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপরও একটি বড় সামাজিক বোঝা তৈরি করেছে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জনদুর্ভোগ' সৃষ্টিকারী হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার এই অর্থ ভবিষ্যৎ ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ তহবিলে জমা দিতে হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে মেটার প্ল্যাটফর্মের কারণে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসায় (ক্লিনিক্যাল ও আচরণগত স্বাস্থ্য কর্মসূচি)। বাকি অর্থ ব্যয় হবে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষক ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের পেছনে।
আদালত মেটাকে আগামী দিনে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১৮ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে সুপারিশ করা যাবে না। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীরা কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে মেসেজ পাঠাতে পারবে না।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নগ্নতা পাঠানো বা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করতে হবে এবং যৌন শোষণে জড়িতদের জন্য '১-স্ট্রাইক নীতি' কার্যকর করতে হবে।
রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য 'লাইক' কাউন্ট বন্ধ রাখতে হবে। স্কুলের সময়ে (ছুটির দিন বাদে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত) পুশ নোটিফিকেশন নিষিদ্ধ থাকবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মাসিক সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা বা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টার বাধ্যতামূলক 'ব্যবহার সীমা' নির্ধারণ করতে হবে।
এদিকে আদালতের এই রায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে এবং কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় তারা আত্মবিশ্বাসী বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে এটি একটি বড় আইনি ধাক্কা। নিউ মেক্সিকোর রায় ছাড়াও লস অ্যাঞ্জেলেসে একই ধরনের মামলায় হেরেছে মেটা। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিশু গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে আরও ডজনেরও বেশি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই টেক জায়ান্টকে।