টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামে (এনআরজি স্টেডিয়াম) উপস্থিত ৬৮,৭৭৭ জন দর্শক গতকাল সাক্ষী হলেন এক ঐতিহাসিক ফুটবল রাতের। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ 'কে'-এর ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করেছে রবার্তো মার্টিনেজের পর্তুগাল। ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিলেন পর্তুগিজ মহানায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যিনি জোড়া গোল করার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য এক কীর্তি গড়েছেন। একাধিকবার হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়ে অল্পের জন্য হাতছাড়া করেন সিআর সেভেন। পর্তুগালের হয়ে বাকি গোলগুলো করেন নুনো মেন্দেস ও রাফায়েল লেয়াও এবং অন্য গোলটি আসে উজবেক গোলরক্ষকের আত্মঘাতী থেকে। এই দাপুটে জয়ের ফলে গ্রুপ পর্বে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্ত করল ইউরোপের এই পরাশক্তি।
প্রথম ম্যাচে ড্র করায় পাহাড়সম চাপ নিয়ে নেমেছিল পর্তুগাল, সবচেয়ে বেশি চাপ ছিলো রোনালদোর ওপর। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা সমালোচনার স্রোতের জবাব দিতে হতো। দেরি করেননি তিনি। ৪১ পেরুনো তারকা ৬ মিনিটেই এগিয়ে নেন দলকে। রোনালদোর জন্য এক নতুন ইতিহাস। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে গোল করার গৌরব। এই কীর্তি গড়া বিশ্বের প্রথম পুরুষ ফুটবলার তিনি। আগের ম্যাচে বিবর্ণ থাকা এই তারকা কাছের পোস্টে রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন। এরপর জোয়াও কানসেলোর নিচু ক্রস থেকে দারুণ এক জোরালো শটে বল জালের নিচের কোণায় পাঠিয়ে দেন, যা ঠেকানোর কোনো সুযোগই গোলরক্ষকের ছিল না। গ্যালারিতে উপস্থিত পর্তুগালের সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। রোনালদো তার ট্রেডমার্ক ‘সু’ উদযাপন সেরে নেন।
ম্যাচের ১৭ মিনিটে ব্যবধান হয়ে যায় দ্বিগুণ। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় পর্তুগাল। সব চোখ ছিল ফ্রি-কিক নিতে প্রস্তুত হওয়া রোনালদোর ওপর। নিজের চিরচেনা স্টাইলে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর পর তিনি বলটি ছেড়ে দেন নুনো মেন্দেসের জন্য। মেন্দেস বাঁ পায়ের নিচু শটে দেয়াল ঘেঁষে বল পাঠিয়ে দেন গোলরক্ষকের ডান দিক দিয়ে পোস্টের ভেতরে। ৩৯ মিনিটে আবার রোনালদোর ঝলক। এবার উৎস ব্রুনো ফার্নান্দেস। মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা পেয়ে বল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। এরপর রক্ষণভাগের পেছন দিয়ে দারুণ এক পাস বাড়িয়ে দেন রোনালদোর উদ্দেশে। রোনালদো তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে ডান পায়ের নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন এবং বল পোস্টের ভেতরের দিকে লেগে জালে জড়ায়। পাসের গতি যেমন একবারে নিখুঁত ছিল, তেমনি ফিনিশিংটাও ছিল চমৎকার। ইউসেবিওকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে পর্তুগালের কোন খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ গোলের মালিক হন তিনি।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে হ্যাটট্রিকও হয়ে যেতে পারত তার। জোয়াও কানসেলোর একটি নিচু ক্রসে বল পেয়ে তিনি গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে আলতো চিপ করেছিলেন। তবে তার আলতো লফটেড শটটি গোললাইন থেকে ক্লিয়ার হতে দেখেন তিনি। বিরতির পরও একই দাপট ধরে রাখে পর্তুগাল। ৬০ মিনিটে চতুর্থ গোলটিও পেয়ে যায় পর্তুগাল। যদিও সেটা ছিল আত্মঘাতী। শুরুতে কর্নার থেকে আসে সুযোগ। যা নিয়েছেন ব্রুনো ফার্নান্দেস। নিচু করে নেওয়া সেই কর্নারে প্রথমে বল স্পর্শ করেন জোয়াও ফেলিক্স। এরপর খুসানোভের গায়ে লেগে বলের গতিপথ বদলায়। তার পর গোলরক্ষক নেমাতভের হালকা ছোঁয়া লেগে তা চলে যায় জালে।
৭৪ মিনিটে হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়ে যাচ্ছিলেন রোনালদো। বক্সে আব্দুল্লায়েভ কিছুটা ঢিলেমি করতেই বলটি তার সামনে চলে এসেছিল। হাফ-ভলিতে নিখুঁতভাবে শট নেন পর্তুগিজ তারকা। দুর্দান্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেভ করে দলকে বাঁচান উজবেক গোলকিপার। ইতিহাস গড়া রাতটাকে আরও স্মরণীয় করতে রোনালদো হ্যাটট্রিকের খোঁজ করছিলেন। দুর্ভাগ্য ভাগ্য সহায়নি তার। ৮৭ মিনিটেই যেমন- ডান দিক দিয়ে নেমে আসা সেমেদো নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়েছিলেন। যা মূলত রোনালদোকে কেন্দ্র করেই ছিল। কিন্তু মাঝপথে প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে বলের গতিপথ বদলে যায়। সেই সুযোগটা লুফে নেন রাফায়েল লিয়াও। কোনো সময় নষ্ট না করে জোরালো শটে বল ঠেলে দেন জালের বাঁ দিকে। এখন ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ “কে”-তে শীর্ষে ফিরেছে পর্তুগাল। ২৭ জুন কলম্বিয়া কঙ্গোকে হারালে তারা তখন শীর্ষস্থান দখলে নেবে।