কূটনৈতিক প্রতিবেদক: রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্তিতে মানবিক সহায়তা থেকে শুরু করে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের দিকে’ শীর্ষক এই সংলাপে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাদের সুচিন্তিত মতামত ও কর্মপন্থা তুলে ধরেন। সবার আলোচনায় একটি অভিন্ন সুর ধ্বনিত হয়েছে; মানবিক সহায়তার বাইরে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই ও চূড়ান্ত সমাধান হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
গতকাল রোববার দিনব্যাপী রাজধানীর গুলশানের লেকশো’র হোটেলে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) ও ব্রিটিশ এনজিও অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের দিকে’ শীর্ষক এই সংলাপে বক্তব্য রাখেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, আইওএম বাংলাদেশে মিশন প্রধান লরা টম বন্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি প্রধান মাইকেল মিলার, চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউয়িন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ফিলসের নির্বাহী পরিচালক ও কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী, সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস’র নির্বাহী পরিচালক এবং এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডীন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত। উপস্থাপনায় অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড মিডিয়া হেড মো. শরিফুল ইসলাম। সমাপনী বক্তব্য রাখেন, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের ফিল্ড অফিস প্রধান জুবাইদা আক্তার, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ১০ বছরের এই দীর্ঘায়িত সংকটকে কোনোভাবেই ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৭ সালের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ববোধ এবং সহমর্মিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের জায়গা থেকেই ১২ লক্ষেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল। ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সফল প্রত্যাবাসনের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উভয়ভাবেই রোহিঙ্গাদের একটি সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
তবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দেন, “মানবিক উদারতাকে যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত না বানানো হয়।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মানবিক সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও বিশ্বাসযোগ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি দু’দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অনুরোধ করেন, “মানবিক সহায়তার ক্লান্তি যেন মানবিক সহায়তার অবহেলায় পরিণত না হয়।” তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিপুল চাপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কক্সবাজারের মানুষের জন্য সহায়তা প্রদান কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামও অনুরূপ মত প্রকাশ করে বলেন, মানবিক ব্যবস্থাপনা এবং স্থায়ী সমাধানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য শুধু সংকট সামলানো নয়, বরং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সম্ভব করে তোলা। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার একটি বড় বাধা হিসেবে তথ্য যাচাইকরণ বা ‘ভেরিফিকেশন’ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং জটিলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম অভিযোগ করেন যে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে গৃহীত যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি কালক্ষেপণ ও বিলম্ব করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তিনি প্রস্তাব করেন, ক্যাম্পে জন্মগ্রহণকারী শিশু এবং নতুন আসা জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রকৃত তথ্যের ভিত্তি তৈরি করার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারও এই বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, প্রত্যাবাসনকারীদের সুরক্ষার সাথে সাথে ফিরে যাওয়ার পর তারা যেন তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে, সে বিষয়েও কথা বলতে হবে। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের আসল পরিচয় ও বার্মিজ অস্তিত্বকে তুলে ধরতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে কক্সবাজারে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার রোহিঙ্গা সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি এই সংকট মোকাবেলায় কার্যকর বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি রোহিঙ্গাদের স্বাবলম্বী করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “আমরা যখন স্বাবলম্বিতার কথা বলি, তার মানে কিন্তু এটি নয় যে আমরা এটিকে প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প হিসেবে দেখছি।” তিনি আন্তর্জাতিক তহবিলের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য রোহিঙ্গাদের এমন দক্ষতা অর্জনে সহায়তার কথা বলেন, যা মিয়ানমারে তাদের টেকসই পুনর্বাসনে কাজে আসবে। তিনি জানান, ইইউ রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় উভয় সম্প্রদায়ের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে।
আইওএম বাংলাদেশ-এর মিশন প্রধান লরা টম বন্ড স্থানীয় বা স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সাড়াদান কর্মসূচির মূল কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রচলিত পাঁচটি পথের (দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক, বিচারিক এবং নিষেধাজ্ঞা) সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে একটি নতুন ধারণার প্রস্তাব করেন ‘আরাকান স্ট্যাবিলাইজেশন প্ল্যান’ বা আরাকান স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা। তিনি মার্শাল প্ল্যান এবং চীনের বিআরআই উদ্যোগের উদাহরণ টেনে বলেন, কেবল চাপ প্রয়োগ নয়, বরং অর্থনৈতিক সুযোগ বা প্রণোদনার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনার আওতায় রাখাইন অঞ্চলে কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং উৎপাদন শিল্পের উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তিনি প্রস্তাব করেন, ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের দক্ষতা উন্নয়নকে সরাসরি এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ রাখাইনের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, বাংলাদেশ আশ্রয়ন, নিরাপত্তা ও জমি দিয়ে অনন্য মানবিক উদারতা দেখিয়েছে। তবে দীর্ঘায়িত এই সংকটের ফলে বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ, অবকাঠামো, জীবিকা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, শরণার্থীরা এখনও শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগ, ক্যাম্পের অবনতিশীল পরিবেশ, দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। অর্থায়নের ঘাটতির কারণে খাবার, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলোকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। এই ১০ম বর্ষপূর্তি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক পালনের বিষয় নয়; এটি সংকট পুনর্বিবেচনা করা, বাংলাদেশের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, নতুন ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার দরকার।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ত্রাণ নির্ভরতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো, সহানুভূতি থেকে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, এবং পরিশেষে একটি সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া এই সংকটের কোনো চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, এখন বিশ্বকে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে।
ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল উদ্বেগ বা বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা, ধারাবাহিক মানবিক অর্থায়ন এবং প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’।
ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর দেখতে দেখতে ১০টি বছর কেটে গেছে। রোহিঙ্গা সংকট ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড বা অর্থায়ন দিন দিন কমে আসছে। বক্তারা একটি বিষয়ে একেবারেই পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন; চূড়ান্ত সমাধান লুকিয়ে আছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মধ্যেই।
সরকারি ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্তিতে এই সংলাপ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট; সময় গড়িয়ে যাচ্ছে এবং সংকটের মাত্রাও বাড়ছে। সমাধানের একমাত্র পথ নিরাপদ প্রত্যাবাসন।