ইবরাহীম খলিল, এম এ আর মশিউর যশোর থেকে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যে জুলাই সনদ আমার সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সই করেছি সেই সনদ আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। সেই জুলাই সনদের প্রত্যেকটি শব্দ প্রত্যেকটি লাইন বিএনপি সংসদে পাশ করবে। তিনি বলেন, এই জুলাই সনদ নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারেক রহমান।
গতকাল যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে বিশল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে তিনি জেলার শার্শা উপজেলার উলশী খাল ওরফে জিয়া খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। শার্শা থেকে ফিরে যশোর সার্কিট হাউসে স্বল্প বিরতির পর বিকালে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং যশোর ইন্সটিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন।
বিকেলে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যারা স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার পর বলেছে ক্ষমা করে দিলাম, যারা স্বৈরাচারের সাথে নিয়ে ঢাকা থেকে বাইরে গিয়ে গোপনে মিটিং করে, তারা জনগণের কথা বলছে নাকি; যারা জনগণের জন্য ফ্যামেলি কার্ডের ব্যবস্থা করছে, কৃষকের জন্য কৃষক কার্ডের ব্যবস্থা করে, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সেই বিষয়গুলো জরুরি নাকি বিভ্রান্তিটা আপনাদের কাছে জরুরী? আমি বিশ^াস করি বাংলাদেশের জনগণ শান্তি চায়। সমৃদ্ধি চায়। তাই বিএনপির কর্মসূচিগুলো যেকোন মূল্যে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তারেক রহমান নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আমাদের সতর্ক হতে হবে সেই সব লোকেদের বিরুদ্ধে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়। যারা স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যারা মানুষকে বিভ্রান্তির চেষ্টা করেছিল, যারা ৯১ এবং ৯৬ এ ব্ল্যাকমেইল করেছিল, যারা ২০০৮ সালে বিভ্রান্তি করেছিল, একই লোকজন ২০২৬ সালে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। আজকে আমাদের দেশকে গড়তে হবে। আমরা সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি, তারপর স্বৈরাচার বিতাড়িত হয়েছে।
তিনি বলেন বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়াবে, আমরা দেশ গঠনের কাজ করবো। যারা কাজ করতে চায় দেশ গড়তে চায় তাদেরকেই বাংলাদেশের মানুষ ম্যান্ডেট দিয়েছে। বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন আপনারা অপেক্ষা করুন, আগামিতে যখন সময় আসবে, জনগণ যদি আপনাদের ম্যান্ডেট দেয় তখন আপনারা কাজ করবেন। এবার বিএনপিকে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে তাই বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে।
এসময় তিনি জানান শহীদ জিয়া এবং মরহুম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজের পাশাপাশি জনগণের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করবো। কারণ বিএনপির লক্ষ্য হচ্ছে একটি সম্দ্ধৃ বাংলাদেশ। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন।
আমরা সতর্ক থাকবো যাতে দেশে কেউ বিশৃঙ্খলা করতে না পারে। আর কাউকে আমরা সুযোগ দেবো না। শান্তি নষ্ট করে ১৭৩দিন হরতাল পালনের সুযোগ আমরা কাউকে দিবো না। জুজু বুড়ির ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না। দাবিয়ে রাখা যাবে না। আমরা কোন টিকিট বিক্রি করতে চাই না। তিনি স্লোগান তোলেন করবো কাজ গড়বো দেশ সবার আগে বাংলাদেশ।
এলপিজি কার্ড চালুর কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
এদিন সকালে শার্শা উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে অলস বসিয়ে রাখলে চলবে না, এই বিশাল জনশক্তিকে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তিলে তিলে রক্ত দিয়ে হলেও তা পালন করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, গত ৫০ বছর ধরে এই খাল ভরাট ও দখল হয়ে পড়ে ছিল। এতে কৃষকের কোনো উপকার হয়নি। আমরা এই চার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করছি। এর ফলে ২০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবে, ১৪০০ টন বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে এবং প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সরাসরি সুফল পাবে। খালের দুই পাড়ে ৩ হাজার বৃক্ষ রোপণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, খালে পানি থাকলে মা-বোনেরা হাঁস পালন করে বাড়তি আয় করতে পারবেন। আগামী ৫ বছরে আমরা সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার ‘জিয়া খাল’ খনন করতে চাই, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মেয়েদের শিক্ষা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করেছিলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েদের শিক্ষা ডিগ্রি (উচ্চতর) পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ ফ্রি করা হবে। পাশাপাশি মেধাবীদের জন্য থাকবে বিশেষ উপবৃত্তি। মো-বোনদের স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী প্রধান পরিবারগুলোকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেব। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া রান্নার কষ্ট লাঘবে দেওয়া হবে এলপিজি কার্ড।
তারেক রহমান বলেন, আমরা ওয়াদা করেছিলাম ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করব। সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যেই আমরা সেই কাজ শুরু করেছি। এছাড়া বন্ধ কলকারখানাগুলো চালুর প্রক্রিয়া চলছে, যাতে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হয়। মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সরকারি সম্মানি ভাতার কাজও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার বিদায় হয়েছে, এখন দেশ গড়ার পালা। আমরা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব দল মিলে ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষর করেছি। সেই সনদের প্রতিটি শব্দ আমরা বাস্তবায়ন করব।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্রের আভাস দিয়ে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি ও দল গণঅভ্যুত্থানের রায়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে জনগণের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে চায়। ১৭৩ দিন হরতাল করে যারা অর্থনীতি ধ্বংস করেছিল, সেই ভূত এখন আবার অন্য কারো কাঁধে আছর করেছে। এদের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী নতুন স্লোগান দিয়ে বলেন, “গড়বো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সিঙ্গাপুর যদি ৫০ বছরে বদলে যেতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না ? ১৯৭১ ও ২০২৪-এ এদেশের মানুষ অসাধ্য সাধন করেছে, এবারও দেশ গড়তে তারা সফল হবে।সমাবেশে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে উলশী খালের ওপর একটি নতুন ও সুন্দর ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি কোদাল হাতে মাটি কেটে খাল পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।