ক্স আইপিআর বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের সুপারিশ

ক্স বিনিয়োগ সংস্কারে গতি আনতে প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি

বিনিয়োগ নীতি সংস্কারে গতি আনতে সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতিমালা, একীভূত বিনিয়োগ আইন এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো অগ্রাধিকারমূলক সংস্কারের সুপারিশ এসেছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। আঙ্কটাডের (ইউএনসিটিএডি) ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ (আইপিআর) ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্টে এসব সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

গতকাল সোমবার ঢাকায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও আঙ্কটাডের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগ সহজীকরণে বিডাকে প্রধান সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং ডিজিটাল বিনিয়োগ সেবা সম্প্রসারণে অগ্রগতি হয়েছে। তবে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে এখন সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি, একীভূত আইন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি।

অনুষ্ঠানে আঙ্কটাডের ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ বিভাগের পরিচালক ন্যান লি কলিন্সের ভিডিও বার্তা প্রদর্শন করা হয়। পরে সংস্থাটির লিগ্যাল অফিসার কিয়োশি আদাচি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারারির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় সুপারিশ বাস্তবায়নের পথনকশা নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও বাংলাদেশ এই সময়কে প্রস্তুতি জোরদারের সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়। তিনি বলেন, এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৩ সালের তুলনায় এফডিআই পরিস্থিতিতে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার প্রায় স্থির রয়েছে, বরং কিছুটা কমেছে। অনেক পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক ছিল ১ হাজার ৮২৯ দশমিক ৪ কোটি ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ছিল ২৪ হাজার ৯১৪ দশমিক ১ কোটি ডলার, ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৬ কোটি ডলার এবং কম্বোডিয়ার ৫ হাজার ২৬৬ দশমিক ৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম ১৩ গুণ, ইন্দোনেশিয়া প্রায় ১৭ গুণ এবং কম্বোডিয়া প্রায় ৩ গুণ এগিয়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৮০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু ২০২৪ সালে তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি আমদানি বিলম্ব, শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ, রাজনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ২০২৫ সালের প্রাথমিক সূচকে কিছু পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণের মাধ্যমে এফডিআই প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়ারতেœ বলেন, সংস্কারের ইচ্ছা থেকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছতা, সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগ নীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

প্রতিবেদনে তিনটি অগ্রাধিকার সামনে আনা হয়–প্রথমত, বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের জন্য সংস্কারের ইচ্ছার জায়গা থেকে সংস্কার বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছতা, পূর্বাভাস করতে পারার সুযোগ ও আস্থা প্রয়োজন। তাঁদের জানতে হবে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য সংস্কার মানে কেবল আইন, নীতি বা প্রণোদনা নয়, বরং সংস্কারের পরিকল্পনা, সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ নীতি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিনিয়োগ কেবল বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করার বিষয় নয়।

বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত সংলাপে র্যাংগস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ, বিল্ডের প্রধান নির্বাহী ফেরদৌস আরা বেগমসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।

আয়োজকরা বলছেন, আইপিআর বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করবে।