বিএনপি সরকারের ছয় মাসে প্রবাসে কর্মসংস্থানে বড় ধস নেমেছে। চলতি বছরে প্রবাসে শ্রমিক গমন কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস যে সংখ্যক জনশক্তি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রবাসে গমন করেছিল এবছর তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছর বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছেন চার লাখ ৮০ হাজার ১০৪ জন। আর গত মাসে প্রবাসে গমনের সংখ্যা ৭১ হাজার ৮৪ জন। গত বছরে অর্থাৎ ২০২৫ইং সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল সাত লাখ চার হাজার ৬০৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪৯৯ জন, যা প্রায় ৩২ শতাংশের পতন। এদিকে প্রবাসে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। বাংলাদেশের মতো দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান লাখো পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান পথ। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে শুধু অভিবাসন খাত নয়, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাত মাসে জনশক্তি রপ্তানির ৩২ শতাংশ পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। তবে এটিকে শুধু সাময়িক পতন হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। বরং এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতাকে সামনে এনেছেÑদেশের শ্রমবাজার এখনো কয়েকটি গন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। একইসাথে সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে বিদেশ গমনের প্রবাহের ধারা এমনভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্য কোনভাবেই পূরণ যে হবে না; তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। প্রবাসী কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবের কথা বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

সরকারের পক্ষ থেকে এরূপ বক্তব্য দেওয়া হলেও অন্য দুর্বলতার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা হলো শ্রমবাজার যথেষ্ট বিস্তৃত না হওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মীর চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে এসব বাজারে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক মন্দা, নিয়োগনীতি পরিবর্তন কিংবা নিরাপত্তাজনিত সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। তার মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন শ্রমবাজার তৈরি এবং পুরোনো বাজার সম্প্রসারণ করা না গেলে বিদেশে যাওয়ার মানুষের আকাক্সক্ষা কমবে না। বরং বৈধ সুযোগ সীমিত হলে ঝতকিপূর্ণ পথে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার উদ্বেগজনক দিক হলো অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিল সবচেয়ে বড় অংশ। ওই অঞ্চল থেকে ইউরোপে পৌঁছানো প্রায় ৪৭ হাজার ২০০ অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ ছিল ৫০ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান ও ইরাকÑএই ছয়টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে মোট তিন লাখ ৪৮ হাজার ৫৩২ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্দানে গিয়েছিলেন পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জন। তুলনাযোগ্য পাঁচটি প্রধান মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এ বছর কর্মী যাওয়া কমেছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৩ জন। পতনের হার প্রায় ৪১ শতাংশ।

এই হিসাব দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার কতা অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। একটি বা দুটি বড় বাজারে নিয়োগ কমলেই সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যান দ্রুত নেমে যায়। অতীতেও বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বলে সতর্ক করেছেন।

প্রবাসী বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও যদি তা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো একটি অঞ্চলের সংকট পুরো অভিবাসন খাতকে অস্থির করে দিতে পারে। তাই শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য না রেখে দক্ষ কর্মী তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি পেশা, শিল্পকারখানা, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সেবাখাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে সরকারি পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ বিশ্বজুড়ে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো সেই চাহিদার সঙ্গে দেশের কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। এব্যাপারে বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদের সাথে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিএমইটির সহকারী পরিচালক মো. ফখরুল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, জনশক্তি প্রেরণের পরিসংখ্যান ওয়েবসাইটে আছে। আর অন্য কোন বক্তব্যের জন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম মনে করেন, বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো নিয়ে সরকার শ্রমখাতের সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মূল কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি একটি বিশেষ কার্যকরী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া দালালচক্র ও সিন্ডিকেটমুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিদেশে যাওয়ার খরচ যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে আয় শুরু করার আগেই বড় ঋণের বোঝায় পড়ে যান। এর ফলে তার উপার্জনের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায় এবং দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।

অবশ্য ভিন্ন মতও আছে। বিদেশে কতজন কর্মী গেলেনÑশুধু এই সংখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সাফল্য বিচার করা ঠিক হবে না বলেও মনে করেন কেউ কেউ। কর্মীদের দক্ষতা, বিদেশে তাদের আয় এবং দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান মনে করেন, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেলেও একই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। অর্থাৎ শুধু বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠালেই দেশের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত সুফল নিশ্চিত হয় না। কর্মীরা কী ধরনের কাজ করছেন, তাদের বেতন কত, তাদের দক্ষতা কতা এবং তারা দেশে কত অর্থ পাঠাতে পারছেনÑএসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

অবিভাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসানের মতে, মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে। তবে এই সাময়িক পতনকে বড় সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে আগামী ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছরে আরও দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। আরেক বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, যাদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য আছে, তাদের অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে ইউরোপে স্থায়ীভাবে থাকার আশায় বেশি অর্থ ব্যয় করে অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতাও কিছতা বেড়েছে, যার প্রভাব ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও রয়েছে। তার মতে একই সঙ্গে দক্ষতা বাড়ানো, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ বিদেশে একজন কর্মী যাওয়া মানে শুধু একটি সংখ্যা বাড়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি গ্রামের অর্থনীতি এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়। তাই জনশক্তি রপ্তানির এই পতনকে সাময়িক পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে নতুনভাবে সাজানোর একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা জরুরি।

সমস্যার উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ হলো, জনশক্তি পাঠানোর বাজারকে বহুমুখীকরণ, কর্মীর দক্ষতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ম্য রোধ করা। সেইসাথে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার নতুন দেশে শ্রমবাজার তৈরি করা এবং অদক্ষ কর্মীর বদলে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করা।