হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন পৃথিবীতে আগমন করেন; তখন সময়টা ছিল খুব অস্থির। সেই অস্থির সময়ের মধ্যেও বিশ্বজুড়ে চলতো কাব্যচর্চা। মহানবী (সা.) যে স্থানে জন্মগ্রহণ অর্থাৎ পবিত্র মক্কানগরী তখনো ছিল কবিদের কবিতা চর্চার তীর্থস্থান। মক্কানগরীতে কাব্যচর্চা এমন এক রূপ ধারণ করেছিল যে, খ্যাত-বিখ্যাত ওকাসের মেলাকে কেন্দ্র করে কবিদের মধ্যে চলত বড়ত্বের লড়াই বা কবিতাযুদ্ধ। সেখানে প্রতি বছর সাতজন কবির কবিতা শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় দেওয়া হতো। সাতজন সেরা কবির কবিতার পুরস্কার হিসেবে মিসরের মিহি কাপড়ে সোনার হরফে লিখে কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং এর সংকলনের নামকরণ করা হতো ‘আস সাবউল মুয়াল্লাকা’। কাব্যচর্চা অত্যন্ত সম্মানিত দক্ষতা হিসেবে দেখা হতো সেসময়। কবিতার মাধ্যমে আরবরা কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করত। সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও কবিতার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উপজাতিরা সংঘর্ষে লিপ্ত হলে কবিরা তাদের উপজাতির সম্মান রক্ষা করতেন কবিতায়।

একথা বলা যায় কবি ও কবিতার জন্য ভুবন খ্যাত এক জনপদেই (৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহানবী (সা.)। মহানবী (সা.)-এর মা হজরত আমেনা (রা.) ছিলেন একজন স্বভাবজাত কবি। রাসূল (সা.) এর পিতা আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর তিনি কয়েকটি শোকগাঁথা গেয়েছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। সুতরাং কাব্য এবং সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা তার এক অনন্য সৃজনশীল রুচির পরিচয় বহন করে। জন্মসূত্রেই কবিতার প্রতিভা ধারণ করেছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। মাঝে মধ্যেই নবীজি (সা.) নিজে কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর নবুওয়াত পাওয়ার পর কবিতাকে গুরুত্ব দিতেন তিনি সম্যকভাবেই। বিশেষ করে কাফেরদের কবিতার জবাব দিতেন কবিতার মাধ্যমে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) শিল্পসাহিত্যের প্রতি বিশেষ করে, কবিতার প্রতি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর ছিল এক সহজাত আকর্ষণ। ওহুদ যুদ্ধের প্রথম দিকে মহানবী (সা.) হাতের একটি আঙুলে ব্যথা পেলে হঠাৎ গেয়ে ওঠেন-‘হাল আনতে ইল্লা ইসবাউন দামিতাহ/ ওয়া ফি সাবিলিল্লাহি মা লাকিতাহ’। অর্থ: ‘হে আঙুলি! তুমি তো একটি আঙুল বৈ কিছুই নও।/ সুতরাং যা কিছু হয়েছে তা আল্লাহর রাস্তায় হয়েছে। (অনুশোচনা ও দুঃখ কিসের?)

ইসলাম যুগে রাসূলের (সা.) আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হাসসান ইবন ছাবিত (রা.)। একইভাবে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর ইবন কুহাফা, দ্বিতীয় খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব ও চতুর্থ খলিফা আলি ইবন আবু তালিব (রা.) কবিতাচর্চা করেছেন। এ ছাড়া কাব ইবন মালিক, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.) রাসূলের কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

মহানবী (সা.) যখন গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন, জাহেলি যুগের ওইসব কবির মোকাবিলা একমাত্র কবিতা দিয়েই সম্ভব, তখনই তিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেন। রাসূলের যুগে ইসলাম ও নবীজির সমর্থনে কাব্যচর্চা করেছেন এমন আরও বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহাবি কবি ছিলেন। রাসূল (সা.) মসজিদে মিম্বর স্থাপন করে দিতেন কবিতা আবৃত্তির জন্য। কবিতায় ইসলাম ও নবীজির প্রতিরক্ষা এবং কাফিরদের প্রতি জবাব দেওয়া হতো। হযরত হাসসান ইবনে ছাবিত (রা.): তিনি রাসূল (সা.)-এর মূল সভাকবি ছিলেন। অন্য সাহাবিদের মধ্যে ছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.): আনসারি সাহাবি ও বিশিষ্ট কবি, যিনি মুতার যুদ্ধে শহীদ হন। তিনি ইসলামের প্রচার ও জিহাদের ময়দানে উৎসাহমূলক কবিতা আবৃত্তি করতেন। হযরত কাব ইবনে জুহাইর (রা.): প্রখ্যাত কবি জুহাইর ইবনে আবি সুমার পুত্র, যিনি প্রথমে ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিখ্যাত কাসিদা ‘বানাত সুয়াদ’ পাঠ করলে রাসূল (সা.) তাঁকে নিজের চাদর উপহার দেন এবং তিনি মুসলিম হন।হযরত কাব ইবনে মালিক (রা.): খাযরাজ গোত্রের বিশিষ্ট সাহাবি ও কবি, যাঁর কবিতা ইসলামের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। হযরত হাসফা বিনতে সিরিন, উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) সহ আরও অনেকেই সমসাময়িক কাব্য ও সাহিত্যচর্চায় পারদর্শী ছিলেন।

রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের সময় আরব দেশে বেশিরভাগ কাব্যের প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, অশ্লীলতা, কাম, ক্রোধ, সম্পদ লুণ্ঠন, অন্যের বিরুদ্ধে উসকানি, গোলযোগ সৃষ্টি, বিপদে ফেলা ইত্যাদি। কিন্তু রাছুল (সা.) ছিলেন পাপ-পঙ্কিল অন্ধকার পৃথিবীতে আলোক বিচ্ছুরিত এক দ্যুতিময় ব্যক্তিত্ব। কি মেধায়, কি মননে, কি ভাষায়, কি আচরণে, সর্বত্র অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কবিতায় যখন আরবের কাব্যবাজার রমরমা, তখনই রাসূল (সা.) লাভ করেন নবুওয়াত-রেসালত।

হযরত হাসসান ইবন ছাবিত (রা.) মুজাহিদদের মধ্যে যুদ্ধের স্পৃহা তৈরিতে ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলামের পূর্বে যেমন কাব্যপ্রতিভায় খ্যাতিমান ছিলেন, তেমন ইসলাম গ্রহণের পরও খ্যাতিমান ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তার কাব্যপ্রতিভা ইসলাম ও রাসুল (সা.)-এর জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার প্রতিটি কবিতা ছিল অর্থবহ ও তত্ত্বপূর্ণ। কাফিররা ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি যত ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তম্মধ্যে কাব্যগীতিও ছিল তাদের অনন্য হাতিয়ার। তারা কবিতার ছন্দে ছন্দে রাসুল (সা.)-এর নিন্দা করত; ইসলামের দুর্নাম রটাত। কাব্যসম্রাট হাসসান (রা.) তাদের সেসব কবিতার দাঁতভাঙা জবাব দিতেন কাব্য রচনার মাধ্যমে। রাসুল (সা.) তাঁর কবিতায় খুশি হতেন এবং তাকে উৎসাহিত করতেন। কখনো মসজিদে নববীতে তার জন্য মিম্বার ছেড়ে দিতেন। তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে প্রিয় নবীর পক্ষে গর্বসংবলিত কবিতা আবৃত্তি করতেন।

আস সুবুহু বাদাম্মিন তল আতিহি’র মতো অমর নাত ও অসংখ্য কবিতার রচয়িতার কবি হাসসান ইবনে ছাবিত (রা.)। হাসসান ইবনে সাবিতের কবিতার একটি অনুপম বৈশিষ্ট্য ছিল, কবিতায় পবিত্র কোরআনের শব্দ ব্যবহার। নবীজি তার কবিতা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। কবি সেই মিম্বারে দাঁড়িয়ে মুনাফিক, কাফিরদের নিন্দাসূচক কাব্যের জবাব দিতেন। কখনো কখনো স্বয়ং নবীজি বলতেন, ‘হে হাসসান আমার পক্ষ থেকে উত্তর দাও।’

বনু খাজরাজ গোত্রের উত্তরসূরি এই মহান সাধক ছিলেন একজন শব্দযোদ্ধা হাস্সান ইবন ছাবিত (রা.)। তিনি নবীজির সঙ্গে বেশকিছু জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। হাসসান ইবনে সাবিতের কবিতা তলোয়ারের চেয়ে বেশি ছিল। কাফিরদের কথার জবাব তিনি কবিতার মাধ্যমে দিতেন।

হাসসান ইবনে ছাবিত (রা.) শৈশব থেকেই কবি হিসেবে পরিচিত। কবিতাই তার রুটিরুজির মাধ্যম ছিল। মদিনায় ইসলাম প্রচারের সূচনাতেই তিনি ইসলাম কবুল করেন। তখন তার বয়স ছিল ষাট বছর। ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, ‘তিনি ষাট বছর জাহেলিয়াতের কবি ছিলেন আর পরবর্তীকালে ষাট বছর ছিলেন ইসলামের কবি। হাসসান ইবনে সাবিত বয়স হয়ে গেলেও কিন্তু চিন্তাচেতনায়, কাব্যপ্রতিভায় ছিলেন সিংহের মতোই শক্তিশালী।

হাসসান ইবন ছাবিত দীর্ঘজীবী কবি ছিলেন। তার জীবনকাল ছিল ১২০ বছরের। এর মধ্যে ৬০ বছর কেটে গেছে জাহিলি যুগে। আর ৬০ বছর কেটেছে ইসলামি যুগে। তিনি সাধারণত দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। খণ্ড কবিতাও তার কম নয়। তিনি নগর কবি হিসেবে পরিচিত। কবিতার আবহেই তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁর বাবা ও দাদা উভয়ই কবি ছিলেন। আবার তাঁর ছেলে আবদুর রহমান ও পৌত্র সাইদও কবি ছিলেন। কবির এক কন্যা ছিল। তিনিও কবি ছিলেন। তাঁর কবিতার বিরাট সংকলন বা দিওয়ান রয়েছে। এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত, তিউনিশিয়া, বৈরুত ও মিসরের র্প্রেস থেকে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে।

হাসসান বিন ছাবিত (রা.) সহ ধর্মান্তরিত কবিরা নতুনভাবে কবিতাকে বিন্যাস করেন। এতকাল তিনি যে কবিতা রচনা করেছেন, তা বাদ দিয়ে ইসলামের নানা উপাদান ব্যবহার করেন কবিতায়। ফলে আরবি সাহিত্যে নতুন এক ধারা সূচিত হয়।

লেখক:

সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক সংগ্রাম)