হারুন ইবনে শাহাদাত

মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং ধারণানির্ভর। তাই প্রকৃত জ্ঞান পরিমাপের স্কেল এবং বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের কষ্টিপাথর অহি বা আসমানি কিতাব। তাই ন্যায়বিচার করা কিংবা ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব গড়া অহির জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়। সেই অহির জ্ঞান হাতেকলমে মানুষকে শিখাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগে যুগে নবী ও রাসূলদের পাঠিয়েছেন। এ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং আদর্শ হলেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা.।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ সনদ বা সার্টিফিকেট দিয়ে ঘোষণা করেছেন,‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ- তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ সূরা আহযাব: ২১।

হজরত মুহাম্মদ সা.-ই যে আদর্শ বা একমাত্র অনুসরণীয় বিচারক এ কথা স্থূল বুদ্ধির মানুষরা মানবে না। কারণ তাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং ধারণানির্ভর। কিন্তু যে সকল মানুষ ‘আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে’ অর্থাৎ মুমিন তারাই তাঁকে সর্ব উত্তম আদর্শ হিসেবে মানবে। তারাই সীমাবদ্ধ এবং ধারণানির্ভর জ্ঞানের সীমানা অতিক্রম করতে পারে। উল্লেখিত আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ কথাই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এমন কী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়- ন্যায় ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্লোগান তুলে তারা মুহাম্মদ সা-এর আদর্শ বিচারব্যবস্থা বদলে ফেলে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। পৃথিবীকে শাসক-শাসিত, উৎপাদক-শোষক, রাজা-প্রজা এবং শ্রমিক মালিকের দেওয়াল তুলে বিভক্ত করে ফেলেছে। এক শ্রেণি অন্য, শ্রেণিকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। অস্ত্র, জোট আর ভেটো ক্ষমতার বলে প্রতিনিয়ত ন্যায় ও ইনসাফকে হত্যা করছে। যা প্রতিহত করে ন্যায় ইনসাফের পৃথিবী গড়া রাসূল সা. এর আদর্শের অনুসারী একজন মুমিনের ঈমানের দাবি।

ঈমানের দাবি

যারা আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতকে অস্বীকার করে তারা ন্যায়, ইনসাফ হত্যা করবে। মানবতাবিরোধী অপরাধ করবে। অন্যায়ভাবে শাসন ও শোষণ করবে - এ নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু ঈমানদার মুমিন মুসলিমদের জন্য এটা সম্পূর্ণ বেমানন। কারণ ঈমানের দাবি রাসূল সা.কে আদর্শ বিচারপতি হিসেবে মনে-প্রাণে মেনে নেওয়া। আল্লাহর ঘোষণা, ‘অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা কখনই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের মকদ্দমায় তোমাকে বিচারক রূপ মেনে নেয়। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা বা দ্বিধা স্থান না পায় এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়।’ -সূরা আন-নিসার ৬৫। এ সংক্রান্ত আরো অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে। যেমন: ‘যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।’ সূরা আল-মায়েদা: ৪৪। ‘যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচারফয়সালা করে না, তারাই হচ্ছে জালিম।’ সূরা আল-মায়েদা: ৪৫। ‘যারা আল্লাহর নাযিল করা আইনের ভিত্তিতে বিচার করে না, তারাই হচ্ছে ফাসেক।’ সূরা আল-মায়েদা: ৪৭ ।

ইসলামী স্কলার ও মুফাসসিরদের মতে, আল্লাহর বিধান ও রাসূলের বিচার না মানার বিষয়টি দুই স্তরে বিভক্ত: ১. বড় কুফরি, কুফরে আকবার: যদি কোনো ব্যক্তি রাসূল সা. -এর বিচার বা আইনকে অচল, অনুন্নত মনে করে কিংবা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের ইচ্ছামতো চলাকে হালাল মনে করে, তবে সে সর্বসম্মতিক্রমে ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যাবে।

২. ছোট কুফরি বা কুফরে আসগার: যদি কোনো ব্যক্তি রাসূলের বিচারকে মনেপ্রাণে সত্য ও অবশ্য পালনীয় মনে করে, কিন্তু নিজের লোভ, স্বার্থ বা দুর্বলতার কারণে কোনো ক্ষেত্রে ভুল বিচার করে বা শরিয়তের আইন লঙ্ঘন করে, তবে সে সরাসরি কাফের (ইসলাম থেকে খারিয) হয় না; বরং সে পাপী, জালিম বা ফাসেক হিসেবে গণ্য হয়। ইসলামের মূল ভিত্তিই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.-এর সম্পূর্ণ আনুগত্য করা। রাসূল সা.-এর কোনো ফয়সালাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করার অর্থই হলো আল্লাহর কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা।

আল্লাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে ন্যায়প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মুক্তবুদ্ধির দার্শনিকরাও বিষয়টি অস্বীকার করার সাহস দেখায়নি। তাই পৃথিবীর প্রত্যেক আইন গ্রন্থতেই স্বীকার করা হয়েছে, আইনের প্রধান উৎস আসমানী কিতাব বা ওহি। আল্লাহকে যারা ঈশ্বর বলেন সেই অমুসলিমদের ভাষায় ঐশি জ্ঞান।

হজরত মুহাম্মদ সা. আদর্শ ন্যায়বিচারক বিষয়টি বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেওয়া একজন ঈমানদারের ঈমানের দাবি। কিন্তু অবিশ্বাসীদের অন্তরের উপলব্ধি জাগাতে সাধারণ ন্যায়বিচারের ধারণা এবং রাসূল সা. এর ন্যায়বিচারের উদাহরণ তুলে ধরা আবশ্যক।

ন্যায়বিচার কী

সাধারণ ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’ বা Justice হলো- প্রতিটি সত্তাকে তার উপযুক্ত ও প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা। নিরপেক্ষতা, সত্যবাদিতা এবং কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই হলো ন্যায়বিচারের মূল দর্শন। এটি এমন এক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে অপরাধী তার কৃতকর্মের আনুপাতিক শাস্তি পায় এবং ভুক্তভোগী লাভ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা বিচার। পাশ্চাত্য দর্শন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ন্যায়বিচার বলতে মূলত প্রথাগত আইন মেনে চলা, সাম্য ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তাকে বোঝায়। অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক জন রলস (John Rawls) সবাই ন্যায়বিচারকে সমাজের প্রথম ও প্রধান গুণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায়বিচার প্রায়শই চরম আপেক্ষিক। কারণ, মানুষের তৈরি আইনের সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতার প্রভাবে তা সহজেই পক্ষপাতদুষ্ট।

রাসূল সা. বিচার করার জন্য নিজে আইন তৈরি করেননি। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত আইনে বিচার করেছেন। তাই তার বিচারে অণুপরিমাণ পক্ষপাতদুষ্টতা নেই। যদিও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু দার্শনিক ও পণ্ডিত তা বুঝতে ভুল করেন। বিষয়টি সর্বজনীন ন্যায়বিচারের ধারণার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায়।

সর্বজনীন ন্যায়বিচারের ধারণা

সর্বজনীন ন্যায়বিচারের ধারণার মূল বিষয় তিনটি: ১. আইনের চোখে সবাই সমান: রাজা বা প্রজা, ধনী বা দরিদ্র সবাই একই আইনের অধীন। ২. পক্ষপাতহীন নিরপেক্ষতা: বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচারালয়ে কোনো পার্থক্য তৈরি করা যাবে না। ৩. মৌলিক অধিকারের নিরাপত্তা: বেঁচে থাকা, বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা।

বিশ্বজনীন এ ধারণার উদ্দেশ্য মহৎ হলেও প্রয়োগের জায়গায় বিশ্বজুড়ে রয়েছে এক বিশাল শূন্যতা। আন্তর্জাতিক আদালতে ভেটো ক্ষমতার প্রয়োগ কিংবা নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সর্বজনীন ন্যায়বিচার কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে অনুপস্থিত।

রাসূলের শিখানো ইসলামে ন্যায়বিচার

ইসলামে ‘ন্যায়বিচার’ কেবল কোনো প্রশাসনিক বা আইনি শব্দমালা নয়। এটি ঈমানের অঙ্গ। ইসলামী পরিভাষায় ন্যায়বিচারকে ‘আদল’ এবং ‘কিসত’ বলা হয়। আদলের আভিধানিক অর্থ ন্যায়বিচার, ইনসাফ, সমতা বা ভারসাম্য রক্ষা করা। পবিত্র কুরআনে ‘আদল’ শব্দটি বিভিন্ন রূপে ১৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে। কিসতের আভিধানিক অর্থ হলো ন্যায়নিষ্ঠ অংশ, সুবিচার বা হক ফিরিয়ে দেওয়া। এটি সাধারণত দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য ন্যায়বিচার (যেমন: মাপে ঠিক রাখা, লেনদেনে সমতা বা আইনি বিচার) বোঝাতে বেশি ব্যবহৃত হয়। আল-কুরআনে ‘কিসত’ শব্দটি ১৫ বার এসেছে। নারীর সম্পত্তিতে অধিকার, বাবার আগে সন্তান ইন্তিকাল করলে সেই এতিম সন্তানের অধিকার ও কোন দম্পত্তির শুধু কন্যা সন্তান থাকলে তার সম্পত্তিতে ভাতিজাদের অধিকার বিষয়গুলো মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে ভুল করে। কিন্তু এতে যে আদল ও কিসত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের চলমান ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়।

নারীর সম্পত্তিতে অধিকার ভাইয়ের অর্ধেক বোন কেন পান তা নিয়ে বিস্তর আলোচনায় অনেকটা পরিষ্কার। অন্য দুটি বিষয় ব্যাখ্যা করলেও বিষয়টি যে কতটা ন্যায্য তা বুঝত কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যেমন: দাদার আগে বাবা মারা গেলে এতিমদের যাবতীয় দায়িত্ব দাদা এবং চাচাদের পালন করতে হয়। এজন্য ভরণপোষণের খরচ আছে। সেই দৃষ্টিতে দাদা সম্পত্তিতে তাদের কোন অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় নি। ইনসাফের দায়িত্ব দাদাকে দেয়া হয়েছে। তিনি তার সম্পদ থেকে ইনসাফ ও শরীয়ত নির্ধারিত অসিয়তের আলোকে তাদের হক আদায় করবেন। (বিস্তারিত জানতে পড়ুন; তাফসির ইবনে কাছীর সূরা আন-নিসা, আয়াত ১১ এর ব্যাখ্যা, ফিকহ গ্রন্থ: আল-হিদায়াহ (আল-মারগিনানি) এবং আল-ফিকহ আল-ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু (ড. ওয়াহবা জুহাইলি)।

এভাবে কন্যা সন্তানের বাবাদের সম্পত্তিতে ভাতিজাদের হকের কারণ বৃদ্ধ বয়সে সেই বাবাকে অসহায় অবস্থা থেকে রক্ষা করা। কারণ কন্যাদের বিয়ের পর অন্য সংসারে চলে যায়, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবার বসবাস করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। তখন ভাতিজাদের দায়িত্ব পুত্রসন্তানের মতো চাচাকে আগলে রাখা। (বিস্তারিত জানতে পড়ুন; তাফসির আল-কুরতুবি: জাহেলি যুগের প্রথার বিপরীতে ইসলামে নারীর নির্দিষ্ট শেয়ার নিশ্চিত করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি রক্ষায় পুরুষ স্বজনদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বের সম্পর্ক বিশ্লেষণ।) এ ছোট নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়।

নিরপেক্ষতার মানদণ্ডে শ্রেষ্ঠ

রাসূল সা. এর ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো, নিরপেক্ষতার মানদণ্ডে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি কোনো নির্দিষ্টগোষ্ঠী, স্বজাতি কিংবা নিজের আত্মীয়স্বজনের পক্ষপাতিত্ব করেন নি। কারণ তিনি বিচার করেছেন আল্লাহর প্রদত্ত বিধানের আলোকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্দেশ প্রদান করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ সূরা আন-নিসা: ১৩৫। এমনকি শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো; তা খোদাভীতির (তাকওয়া) অধিক নিকটবর্তী।’ সূরা আল-মায়েদা: ৮। ইসলামে সুবিচার করা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি একজন ব্যক্তিরও আত্মিক ইবাদত।

মদিনা সনদ: বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান মদিনা সনদ। এতে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের সমান নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা ও সুবিচার পাওয়ার অধিকারকে এতে আইনি রূপ দেওয়া হয়েছিল।

আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান: কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের এক প্রভাবশালী নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে, তার দণ্ড মওকুফের জন্য রাসুল সা.-এর প্রিয় সাহাবি উসামা বিন জায়েদ (রা.) সুপারিশ করতে আসেন। রাসুলুল্লাহ সা. এতে চরম উষ্মা প্রকাশ করেন এবং লোকজনকে একত্রিত করে ঐতিহাসিক এক ভাষণ দেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এ জন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, যখন তাদের কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো সাধারণ ও দুর্বল লোক চুরি করত, তখন তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিতাম।” (সহিহ বুখারি)। যখন অপরাধী জানে যে তার সামাজিক পরিচয়ের কারণে সে ছাড় পাবে না, তখন অপরাধ বহুলাংশে কমে আসে। আইন প্রয়োগের এই নিরপেক্ষতাই মানবাধিকার সুসংহত করে।

বিদায় হজ্বের ভাষণ: মানবজাতির সনদের ঘোষণাহিজরি ১০ম হিজরি সনে আরাফাতের ময়দানে বিদায় হজ্বের ভাষণে মহানবী (সা.) সর্বজনীন মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ঐতিহাসিক মূলনীতি ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো অনারবের ওপর আরবের, কোনো কালোর ওপর সাদার কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মানুষে মানুষে পার্থক্য কেবল তাকওয়া বা খোদাভীতির ভিত্তিতে।”

মরুভূমির জাহিলিয়াত বা চরম বর্বরতার যুগে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন ধরণীতে আবির্ভূত হন, তখন আরব সমাজে জোর-জুলুম, গোত্রীয় অহংকার, অন্যায় হত্যাকাণ্ড এবং দুর্বলকে শোষণের জঘন্য মহোৎসব চলছিল। সেই অন্ধকার সমাজে ইনসাফ ও সুবিচারের যে মশাল তিনি জ্বেলেছিলেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়। আজকের অশান্ত বিশ্বে প্রকৃত শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো সেই শাশ্বত ইনসাফ ও সুবিচারের আদর্শে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক:

সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক