শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে একটি অমানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘আয়নাঘর’ বা নির্যাতনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

গতকাল শনিবার গুমের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত ও বিচারের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারক, প্রসিকিউশন দল ও আসামীপক্ষের আইনজীবীরা।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী স্থাপনাটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউশন ও আসামীপক্ষের আইনজীবী এবং সিনিয়র সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর ডিজিএফআইয়ের পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, বিগত সেনা সমর্থিত সরকারের সময় তারেক রহমানকে জেআইসির একটি কক্ষে নেওয়া হয়েছিল। তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের দেওয়া বর্ণনা এবং তদন্ত সংস্থার তদন্তে তারেক রহমানকে জেআইসিতে নেওয়া ও সেখানে নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ডিজিএফআই কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসি ছিল গোপন বন্দীশালা আয়নাঘরগুলোর একটি, যেখানে মানুষকে আটক রেখে নির্যাতন করা হতো।

আমিনুল ইসলাম বলেন, পরিদর্শনের সময় বিচারকেরা এমন একটি স্থাপনার বাস্তব চিত্র দেখেছেন, যেখানে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বন্দী করে রাখা হয়েছিল। অমানবিকভাবে বন্দীদের ধরে এনে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাখা হয়েছে। সেই নির্মম চিত্র আজ পরিদর্শনের মধ্যদিয়ে কিছুটা অনুভব করা যায়।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে এ জেআইসিতে রাখা হয়েছিল এবং তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীকেও সেখানে বন্দী রাখা হয়েছিল। এ ধরনের বন্দীশালার অস্তিত্ব যাতে আর তৈরি না হয়, সে বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আমিনুল ইসলাম।

বাংলাদেশে যাতে আর এ রকম কোনো টিএফআই সেল অথবা জেআইসি বা তথাকথিত আয়নাঘর নামে কোনো টর্চার সেল ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তিনি বলেন।

তিনি আরও বলেন, কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তবে কোনো নাগরিক যেন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার না হন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে একটি অমানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়নাঘর বা নির্যাতনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তার অভিযোগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইসলামি সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ভিন্নমতের ব্যক্তিদের এসব স্থানে ধরে এনে রাখা হতো। তাদের মধ্যে অনেককে পরে গুম করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, টিএফআই ও জেআইসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই এরই মধ্যে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিচার চলছে। তদন্তে ভবিষ্যতে আরও যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে তিনি জানান।

বন্দীদের রেখে যাওয়া লেখার কথাও উল্লেখ করেন আমিনুল ইসলাম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিরা সেখানে বিভিন্ন কিছু লিখে রাখতেন।

শনিবারের পরিদর্শনকে তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। আজ বিচারপতিগণ সরেজমিনে এই টর্চার সেলের বাস্তব চিত্র দেখেছেন। এটি অবশ্যই ন্যায়বিচারের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, তিনি বলেন। তবে, পরিদর্শন ও আয়নাঘর নিয়ে আসামীপক্ষের বক্তব্যের সমালোচনাও করেন চিফ প্রসিকিউটর।

তিনি অভিযোগ করেন, ডিফেন্স টিমের সদস্যরা শেখ হাসিনার মতো করে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং আয়নাঘর সম্পর্কে তাদের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন, গুম ও হত্যার যে অভিযোগগুলো বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসছে, সেগুলো আসামীপক্ষের আইনজীবীরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সাক্ষ্যপ্রমাণে যেটা আসছে সেটি জাতির সামনে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করি, তিনি বলেন। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও তিনি কথা বলেন। তার দাবি, ট্রাইব্যুনালে কোনো গোপন বা ক্যামেরা ট্রায়াল হচ্ছে না এবং বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। আমরা কোনো গোপনীয় ট্রায়াল করছি না। ক্যামেরা ট্রায়াল করি না, তিনি বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এই বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার করা হচ্ছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, তাকেও কিন্তু এই জেআইসি সেলে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। তিনি কতদিন বন্দী ছিলেন, তার নিজের হাতের একটা লেখা ছিল ‘এইচ কিউ সি’। সেটি পরে সাদা রং করে প্লাস্টার করে দিয়েছে। প্লাস্টারের পরেও তার এই লেখাটা কিন্তু এখনো জেআইসি সেলের একটি রুমে আছে। আমরা এগুলো সিলগালা করে রেখেছি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো আমাদের কাস্টডিতে থাকবে। টর্চার সেলের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে এ ঘটনায় আরও যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

অভিযোগ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ৫ আগস্টের পর জেআইসি সেলের অনেক আলামত নষ্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা দেয়াল দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে এবং অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা সেনানিবাসের কচুক্ষেতে অবস্থিত এই বন্দীশালা পরিদর্শনে যান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকসহ প্রসিকিউশন টিম এবং তদন্ত সংস্থার সদস্যরা।

পরিদর্শন করেন ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সঙ্গে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, মুহাম্মদ শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন টিমের অন্যান্য সদস্য, তদন্ত সংস্থার সদস্য ও আসামীপক্ষের আইনজীবীরা।

এর আগে গত ১ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব-১ সদর দফতরে এলিট ফোর্সটির গোপন বন্দীশালা হিসেবে পরিচিত টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও আইনজীবীরা। ওইদিন তারা ছোট-বড় মোট ২৯টি কক্ষ ঘুরে দেখেন এবং সাতটি ডেথ সেলে বন্দীদের আটকে রেখে নির্যাতনের চিত্র সম্পর্কে ধারণা নেন।

গত ২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের প্রেক্ষিতে র‌্যাব, ডিজিএফআই ও ডিবির গোপন বন্দীশালা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাইব্যুনাল-১।