স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে স্বশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত : সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের রায় ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি উঠে আসে। সভার আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক ও চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, কবি লিলি হক প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকার সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ ভবনে ‘বসার জায়গা’ করে দেওয়ার জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে সংবিধানে নির্দেশিত সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার বাইরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।

এছাড়া সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি দলের অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার জন্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না- বলেন সুজন সম্পাদক।

স্থানীয় সরকারের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য ও নীতিগত ভিত্তি তুলে ধরে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের সংবিধানে স্থানীয় সরকারের কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিখ্যাত কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ [৪৪ ডিএলআর(এডি)(১৯৯২)] মামলার রায় অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান।

শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত, সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে সর্বস্তরে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের যথার্থ মাধ্যম। সর্বস্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অভাবে আমাদের দেশে বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে অতীতে সবকিছুই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আর কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থাই অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতির জন্ম দেয়।

স্থানীয় সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তি তুলে ধরে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের প্রাজ্ঞ সংবিধান প্রণেতাগণ বাংলাদেশের সংবিধানে এ সম্পর্কে ৪টি অনুচ্ছেদ- ৯, ১১, ৫৯, ৬০ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অনুচ্ছেদ ১১- তে প্রশাসনের সব পর্যায়ে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে অনুযায়ী স্থানীয় সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকার।

স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান সমস্যা, আইনগত অসংগতি ও আদালতের রায় ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনসমূহে বহু অসংগতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা বিদ্যমান এবং অনেকক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত আইনগুলো পরস্পর অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনেকাংশে সেকেলে। সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার আইন দুটি মোটামুটি সচল থাকলেও গ্রামীণ স্থানীয় সরকার অর্থাৎ জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের আইনে গুরুতর সমস্যা রয়েছে।