• আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে হিমালয়ের বরফ
  • জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান বাড়াতে হবে

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়া এলাকায় হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে আসে লহেন্দে খোলা ও ভোতে কোশি নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে তা প্রলয়ংকারী আকস্মিক বন্যায় রূপ নিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, ঝুলন্ত সেতু, সীমান্ত অবকাঠামো এবং নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাটি কেবল নেপালের পাহাড়ি সীমান্তের একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য, বিশেষ করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক সতর্ক সংকেত। হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত পলি ভাটির দেশ বাংলাদেশের দিকে এসে নদীর নাব্য কমিয়ে দিবে, ফলে আকস্মিক বন্যা ধান ও ফসল তলিয়ে দিতে পারে। যার ফলে দেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই অবস্থায় জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান বাড়াতে হবে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে। বর্তমান বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের উচ্চহার অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ (২১০০ সাল) হিমালয়ের বর্তমান হিমবাহের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমাটবদ্ধ মাটির স্তর বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে হিমালয়ের খাড়া পাহাড়ি ঢাল ও পাথর মারাত্মক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, যা ঘন ঘন তুষারধস ও নদী অবরুদ্ধকরণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হিমালয়ে বরফ-শিলার অস্থিতিশীলতা, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে; ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? এই প্রশ্ন দেশে পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের।

রয়টার্স ও এপি-এর তথ্যানুযায়ী, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নদীর পানি কয়েক মিটার উঁচুতে উঠে অববাহিকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নেপালের এবারের বিপর্যয়ে প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে বরফ ও বিশাল শিলাখণ্ড একসঙ্গে ধসে লহেন্দে খোলা ও ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় তীব্র আছাড় খায়। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের পানি, বরফ, সমাজ ও প্রতিবেশব্যবস্থা- ICIMOD -এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমালয়ের হিমবাহগুলো তার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে গলে হারিয়ে গেছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ২০২৫ এর এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এশিয়াজুড়ে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ, চরম বর্ষণ ও পাহাড়ি আকস্মিক বন্যা অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে, যার জন্য শক্তিশালী আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের পানি, বরফ, সমাজ ও প্রতিবেশব্যবস্থা- ICIMOD-এর তথ্য মতে, গঙ্গা নদী অববাহিকা বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের প্রায় ৬০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকা বাংলাদেশ, ভুটান, চীন ও ভারতের প্রায় ১১ কোটি মানুষের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও নেপাল সরাসরি ভৌগোলিক সীমান্ত শেয়ার না করলেও উভয় দেশই অভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ। হিমালয় পর্বতমালা থেকেই উৎপাদিত হয়েছে এশিয়ার প্রাণসংহারী ও জীবনদায়ী নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র। হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বরফ গলন, নদীর তলদেশে বিপুল কাদা-পাথর জমে যাওয়া কিংবা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে তার সরাসরি অভিঘাত এসে পড়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও এপি এর ২৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৫২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এখনও প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নতুন করে পাহাড়ি ধসে সৃষ্ট অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে পুনরায় প্লাবনের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ বন্যার চেয়ে আকস্মিক বন্যা বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ অনেক বেশি বিধ্বংসী। এর পেছনে মূল বৈজ্ঞানিক কারণগুলো বোঝা জরুরি। খুব অল্প সময়ে (কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে) নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া। পাহাড়ি এলাকায় এর সঙ্গে পাথর ও কাদা মিশে ক্যাসকেডিং দুর্যোগ তৈরি হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে গলে যাওয়া বরফ পাহাড়ের ঢালে জমা হয়ে ‘গ্লেসিয়াল লেক’ বা হিমবাহ-হ্রদ তৈরি করে। এসব হ্রদের বরফ ও মাটির ভঙ্গুর বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি লিটার পানি নিচের উপত্যকায় নেমে আসে, যাকে হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ বলা হয়।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি: ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী জার্নাল অব হাইড্রোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অদূর ভবিষ্যতে বন্যার তীব্রতা ও ঘন ঘন বন্যা হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী জার্নাল অব হাইড্রোলজিতে আরও বলা হয়, হিমালয় অঞ্চলে নেপালের রাসুয়ার মতো কোনো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ক্যাসকেডিং ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশের ওপর তার বহুমুখী প্রভাব পড়ে। পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত পলি এসে নদীর নাব্য কমিয়ে দেয়। ফলে বর্ষার শুরুতে বা অসময়ে অল্প বৃষ্টিতেই তিস্তা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জের বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়ে কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলে আগাম বা অকাল আকস্মিক বন্যা বাংলাদেশের বোরো ধান পুরোপুরি তলিয়ে দিতে পারে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে। অতিপ্রবাহ ও পলির চাপে হঠাৎ নদীভাঙন দেখা দেয়, যা শত শত কোটি টাকার বাঁধ, সেতু, সড়ক ও জনপদ গ্রাস করে। উজানের নদীর পানির তাপমাত্রা, পলি ও রাসায়নিক গঠন বদলে গেলে বাংলাদেশের নদী ও হাওরের মাছের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা জলজ প্রজাতি ও মৎস্যজীবীদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, শুধু প্রকৃতির ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষের অপরিকল্পিত কাজ পাহাড় ও নদীকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল কেটে দুর্বল অবকাঠামো ও সড়ক নির্মাণের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ধস নামছে। নদীতে প্রথাগত ধারার বাইরে অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করার ফলে প্রাকৃতিক জলাধার বাধাগ্রস্ত হয়ে ক্যাসকেডিং দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। হিমালয় ও অববাহিকার স্পর্শকাতর এলাকায় বনাঞ্চল ধ্বংস এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বর্জ্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। তিনি বলেন, এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের বাঁচতে হলে প্রাকৃতি কে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। তা না হলে আমাদের সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। যা থেকে আমাদের কেউ রক্ষা পাব না।

নেপালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবিলম্বে কয়েকটি বাস্তবমুখী ৫টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। তারা বলেন, প্রথমত; চীন, নেপাল, ভারত ও ভুটানের সঙ্গে স্যাটেলাইট, সিসমিক সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের রিয়েল-টাইম উপাত্ত আদান-প্রদান নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত; স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ এবং পলিপ্রবাহ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা। তৃতীয়ত; আগাম সতর্কবার্তা যেন শুধু সচিবালয় বা আবহাওয়া অফিসে আটকে না থাকে। মোবাইল এসএমএস, স্থানীয় মাইক, কমিউনিটি রেডিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে কৃষকদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। চতুর্থত; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নদী তীরবর্তী বনাঞ্চল রক্ষা করা এবং জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা। পঞ্চমত; আঞ্চলিক জলবায়ু কূটনীতি জোরদার করা; হিমালয় অববাহিকাকে একটি একক পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে যৌথ অববাহিকাভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নেপালের রাসুয়ায় ২৬ আগস্টের সেই ভয়াবহ বিপর্যয় এবং তাতে ৫০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি কোনো দূরবর্তী দেশের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একটি আগাম সর্তকবার্তা। হিমালয়ের বরফ ও মাটির স্থিতিশীলতা দ্রুত বদলাচ্ছে, আর নদীর পানি কোনো দেশের পাসপোর্ট বা সীমানা মানে না। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যদি এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কীকরণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় জোর না দেয়, তবে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলবে। হিমালয়কে বোঝা এবং নদীকে তার নিজ গতিতে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্তই হবে বাংলাদেশের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি।