সরকার আগামী বছর থেকে অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক, অর্থবছরের ভিত্তি মাস হবে এপ্রিল। অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কে এক অর্থবছর হিসেবে গণ্য করা হবে। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে এক অর্থবছর হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুবিধার্থে অর্থ বছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। বর্তমান অর্থবছর শেষ হয় জুন মাসে। অর্থবছরের শেষের তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল, মে এবং জুন মাসে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি থাকে। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে মন্থরতা সৃষ্টি হয়। কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, অর্থবছর যদি মার্চ মাসে শেষ হয় তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে অনেকটাই রেহাই পাওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তনের জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে তাদের সে দাবি বা প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। এপ্রিল-মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা নতুন কিছু নয়। বিশ্বের অন্তত ২০টি দেশে এপ্রিল থেকে মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে গণনা করা হয়। ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, দক্ষিণ এফ্রিকা, মিয়ানমার, হংকং, ব্রুনাই ইত্যাদি দেশে ১ এপ্রিল থেকে ৩ মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়। অধিকাংশ দেশ মূলত আবহাওয়াগত সমস্যা এড়ানোর জন্যই এপ্রিল-মার্চ সময়কে বিবেচনায় নিয়ে অর্থবছর গণনা করা হয়। পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশসহ বিশ্বের অন্তত ১৫টি দেশ জুলাই-জুন সময়কে অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানোর জন্যই অর্থবছরের ভিত্তি মাস জুলাই এর পরিবর্তে এপ্রিলে এগিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষ মনে করছেন, অর্থবছরের ভিত্তি মাস এগিয়ে আনা হলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,শুধু অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করা হলেই কি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে? বিভিন্ন সময় গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূরীকরণের কোন সুস্পষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। মোটা দাগে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীর গতির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগদান এবং ঘনঘন প্রকল্প পরিচালকদের বদলি করা ইত্যাদি কারণে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। এছাড়া রয়েছে প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি এবং ঘুষ লেনদেনের কারবার।
বিদ্যমান এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে শুধু অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করা হলে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় যে অর্থবরাদ্দ করা হয় তা মোট জাতীয় বাজেটের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। বছর শেষে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের যে হিসাব দেয়া হয় তার মধ্যে মারপ্যাচ রয়েছে। তারা মূলত বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের পরিসংখ্যানকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের চিত্র হিসেবে প্রদর্শন করে। কিন্তু অর্থ ব্যয় করা এবং বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন এক কথা নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে একটি প্রবণতা আছে তারা অর্থবছরের শেষের দিকে যে কোন প্রক্রিয়ায় হোক বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করার চেষ্টা করেন। এতে প্রকল্পের গুণগত মান নষ্ট হয়।
বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তার প্রস্তুতি আগে থেকেই জানা থাকে। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় কোন কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে এটা আগে থেকেই মোটামুটি জানা থাকে। তাই সে মোতাবেক প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো আগে থেকেই সম্পন্ন করে রাখা হলে অনুমোদিত হবার পর তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। জমি অধিগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় ও সংগ্রহের কাজগুলো এগিয়ে রাখা যেতে পারে। এটা করা হলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজীকরণ হতে পারে।