গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা আয়োজনের অনুমতি বাতিলের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ৬ সেপ্টেম্বর রিট পিটিশন নম্বর ১১৮৮৮/২০২৬ ‘Summarily rejected’ হিসেবে নিষ্পত্তি হওয়ায় রাজবাড়ী মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতি বাতিল করে জেলা প্রশাসনের দেওয়া আদেশ বহাল রয়েছে। ফলে মেলা আয়োজন নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মামলার কার্যতালিকার তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। ২৪ আগস্ট থেকে মামলাটি কার্যতালিকায় আসে এবং কয়েক দফা শুনানির পর ৬ সেপ্টেম্বর তা ‘Summarily rejected’ হিসেবে নিষ্পত্তি করা হয়।
এর আগে ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে ‘ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা-২০২৬’ আয়োজনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৩ আগস্ট থেকে ৩০ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। মেলার প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী এ মাঠ দীর্ঘ সময় মেলার জন্য ব্যবহার করা নিয়ে স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। মাঠটি খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত রাখা, শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থে মাঠের ব্যবহার অব্যাহত রাখার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে নামেন।
‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’-এর ব্যানারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও নাগরিক আন্দোলনে রাজবাড়ী মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মেলা বন্ধের দাবি জানানো হয়। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ধারাবাহিক দাবি ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন মেলার পূর্বের অনুমতি বাতিল করে।
মেলা আয়োজনের অনুমতি বাতিলের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আয়োজক মোঃ ওমর ফারুক বিপুল হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটে জেলা প্রশাসনের বাতিলের আদেশ স্থগিতসহ মাঠে মেলা আয়োজনের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়। তবে সর্বশেষ শুনানিতে রিট আবেদনটি খারিজ হয়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসনের মেলা বাতিলের সিদ্ধান্তই কার্যকর থাকছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, রাজবাড়ী মাঠে আর কোনো মেলা হবে না। মাঠটি এখন থেকে ঈদের জামাত, জানাজার নামাজ ও খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলা বাতিলের জেলা প্রশাসনের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে করা রিটটি খারিজ হয়ে গেছে। ফলে আমাদের দেওয়া আদেশই বহাল রয়েছে।
তিনি বলেন, রাজবাড়ী মাঠ গাজীপুরবাসীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, তরুণদের শরীরচর্চা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে মাঠটি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মেলার অবশিষ্ট অস্থায়ী স্থাপনা ও সরঞ্জাম দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, জনস্বার্থ ও গাজীপুরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিষয়টি প্রশাসনের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। রাজবাড়ী মাঠকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিবর্তে খেলাধুলা, ঈদের জামাত, জানাজার নামাজসহ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের উপযোগী রাখাই হবে প্রশাসনের অবস্থান।
নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আহমদ আলী রুশদী বলেন, রাজবাড়ী মাঠ গাজীপুরবাসীর ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে জড়িত। মাঠটি দীর্ঘ সময় কোনো মেলার দখলে চলে গেলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও সামাজিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। জনগণের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে জেলা প্রশাসন মেলার অনুমতি বাতিল করেছে এবং এখন হাইকোর্টেও রিট খারিজ হয়েছে। এতে গাজীপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি মাঠটি ভবিষ্যতেও খেলাধুলা ও জনকল্যাণমূলক কাজে উন্মুক্ত রাখার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠ সম্পূর্ণরূপে দখল করে আগে কখনো মেলার আয়োজন হয়নি। এবারই প্রথম এমন অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জনদাবির প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসন মেলার অনুমতি বাতিল করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি গাজীপুরবাসীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, মেলাকে ঘিরে লটারি, হাউজি ও জুয়ার আয়োজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। জনক্ষোভের কারণে সে ধরনের উদ্যোগ বন্ধ হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতেও রিট আবেদন খারিজ হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জনস্বার্থ রক্ষার বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। রাজবাড়ী মাঠকে খেলাধুলা, ঈদের জামাত, জানাজার নামাজ এবং জনসাধারণের প্রয়োজনীয় কাজে উন্মুক্ত রাখার যে সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসন নিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হলে গাজীপুরবাসী উপকৃত হবে।
এদিকে রিট খারিজের পর রাজবাড়ী মাঠে থাকা মেলার বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনা ও সরঞ্জাম দ্রুত সরিয়ে মাঠটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে মাঠের বিভিন্ন খালি অংশে তরুণদের ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অবশিষ্ট স্থাপনা দ্রুত অপসারণের পর পুরো মাঠটি আবার শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলা এবং গাজীপুরবাসীর বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে আগের মতো উন্মুক্ত হয়ে উঠবে।