‘উন্নয়ন ও সুশাসনের অঙ্গীকার-গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন হোক সবার।' এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে আসন্ন ২নং গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সরকার। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এ চেয়ারম্যান প্রার্থী মাদক, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক ইউনিয়ন গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মনিরুজ্জামান সরকার তাঁর নির্বাচনী ভাবনা, পারিবারিক পরিচয়, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং গাজীপুর ইউনিয়নকে ঘিরে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, গাজীপুর ইউনিয়ন শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির দিক থেকে একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। নির্বাচিত হলে সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইউনিয়নটিকে আরও উন্নত, আধুনিক, বৈষম্যহীন ও নাগরিকবান্ধব করে গড়ে তুলতে চান তিনি।

‘ইউনিয়ন পরিষদ হবে মানুষের সেবার জায়গা’

মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তাঁর ভাষায়, “মানুষকে সেবা নিতে এসে হয়রানির শিকার হতে হবে-এটা আমি চাই না। ইউনিয়ন পরিষদ হবে মানুষের সেবার জায়গা, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জায়গা।”

নির্বাচিত হলে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার পার্থক্য না করে ইউনিয়নের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। সরকারি বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবহার, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান এ প্রার্থী।

সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম

আলহাজ্ব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সরকার ১৯৭৬ সালে শ্রীপুর উপজেলার ২নং গাজীপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সরকার বাড়ির একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল হক চেয়ারম্যান (রিলিফ/গ্রাম সরকার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি (পুলিশ) আলহাজ্ব তুফাজ্জল হোসেন তাঁর চাচা।

পারিবারিকভাবেই মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও জনসেবার পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দেশ-বিদেশে শিক্ষা, উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা

গাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে গাজীপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে তিতুমীর কলেজে ভর্তি হন। উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়ায় পাড়ি দিয়ে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও এমএ (ইকোনমিক্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে রাশিয়াতেই উদ্যোক্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মনিরুজ্জামান সরকার। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পর ২০১২ সালে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে মারিয়াম ওয়ালটন এক্সক্লুসিভ, মারিয়াম ইলেকট্রনিক্স ও মারিয়াম ফার্নিচার উল্লেখযোগ্য।

পরবর্তীতে ‘এলিট ফার্নিচার’ নামে একটি ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০টি জেলায় ডিলারদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি জৈনা বাজার আহমাদিয়া ফিলিং স্টেশনের অংশীদার হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত

রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন মনিরুজ্জামান সরকার। তিতুমীর কলেজে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়ায় যাওয়ার পর সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা কিছুটা কমে যায়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে জানান তিনি। বর্তমানে ২নং গাজীপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়

রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন মনিরুজ্জামান সরকার। তিনি শ্রীপুর উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের গাজীপুর ইউনিয়নের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী গাজীপুর ঈদগাহ মাঠের ক্যাশিয়ার এবং আহম্মদ আলী নূরানী হাফিজিয়া ও এতিমখানা মাদ্রাসার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

‘মাদক একটি পরিবার নয়, একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে’

নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে মাদক, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত ইউনিয়ন গড়ে তোলার কথা বলেন মনিরুজ্জামান সরকার।

তাঁর মতে, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, “মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”

‘জনপ্রতিনিধির পদ ক্ষমতার নয়, আমানতের’

চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধির পদ তাঁর কাছে ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়; এটি জনগণের আমানত এবং মানুষের সেবা করার দায়িত্ব।

তাঁর ভাষায়, “আমি মনে করি, একজন চেয়ারম্যানের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি মানুষের কতটা কাজে আসতে পেরেছেন। জনগণ যদি আমাকে দায়িত্ব দেয়, তাহলে সেই দায়িত্বকে আমানত হিসেবে নিয়ে কাজ করতে চাই।”

নির্বাচিত হলে নাগরিক সেবা সহজীকরণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, সরকারি সুবিধার সুষ্ঠু বণ্টন এবং ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

‘গাজীপুর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়-সবার’

গাজীপুর ইউনিয়নবাসীর উদ্দেশে মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, “গাজীপুর ইউনিয়ন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়-এই ইউনিয়ন সবার। আমি এমন একটি ইউনিয়ন গড়তে চাই, যেখানে মানুষ তার পরিচয় দিয়ে নয়, নাগরিক অধিকার নিয়ে সেবা পাবে।”

তিনি বলেন, উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হবে। ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ও সম্পদের অপচয় রোধ এবং উন্নয়ন কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

শেষে গাজীপুর ইউনিয়নবাসীর কাছে দোয়া, ভালোবাসা ও সমর্থন প্রত্যাশা করে মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, “আসুন উন্নয়নের পথে চলি, গাজীপুরকে এগিয়ে তুলি। মাদক, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ইউনিয়ন গড়ে তুলতে আপনাদের দোয়া, ভালোবাসা ও সমর্থন প্রত্যাশা করছি।”