রাজশাহী ব্যুরো

উজানের ঢলে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে পানি বাড়তে থাকায় নদীর পানি এখন বিপৎসীমার মাত্র ৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।

এতে পদ্মার দক্ষিণ তীরের চরাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। ইতোমধ্যে চর খিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয়ে বহু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। রাজশাহীতে পদ্মা নদীর বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। এসময় নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ২০ মিটার। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে জানানো হয়, পদ্মায় পানি বাড়লেও রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো ঝুঁকি নেই। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাঁধের কোথাও কোনো ধরনের ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাউবো’র তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ১৫ মিটার। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শুক্রবার সকাল ৯টায় তা বেড়ে ১৭ দশমিক ২০ মিটারে পৌঁছায়। পাউবো সূত্র জানায়, গত প্রায় ১০ দিন ধরে উজানের ঢলে পদ্মায় পানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার দক্ষিণ তীরের চরাঞ্চলগুলোর নি¤œাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। রাজশাহী শহরের বিপরীতে ভারত সীমান্তঘেঁষা চর খিদিরপুর ও খানপুরের বেশির ভাগ এলাকা ইতোমধ্যে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি বাড়তে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পরিবারগুলো। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় প্রশাসনের সার্বিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পানিবন্দী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া দুর্গত এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ ও মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পদ্মার পানি আরো বাড়লে চরাঞ্চলের পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে শহর রক্ষা বাঁধ আপাতত ঝুঁকিমুক্ত থাকায় নগরবাসীর মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক নেই। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন।

আমাদের দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। বর্তমানে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের পানিবন্দী অসহায় মানুষেরও দূর্ভোগ বেড়েছে। সেইসাথে বেড়েছে সাপের উপদ্রব, দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের সংকট।

গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে দুই ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। তলিয়ে যায় যোগাযোগের সব রাস্তা ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি। বাড়ির আঙিনা ও ঘরে হাটুপানি অবস্থার সৃষ্টি হলে অনেকে ঘরের ভেতরে মাচায় ও টিনের চালায় অবস্থান নেয়। পানিতে চরাঞ্চল টলমল অবস্থার সৃষ্টি হলে বৃহস্পতিবার থেকে ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে। তবে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খোলা রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে বন্যাদূর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে নানা ধরনের দূর্ভোগ। সাপের উপদ্রব বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানিরও সংকট।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার পানিবন্দী সোহেল আহমেদ জানান, গত প্রায় একসপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছি। বাড়ির উঠোনে হাটুপানি, ঘরের ভেতরেও পানি। বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই, কোথাও যেতে হলে নির্ভর করতে হচ্ছে নৌকা অথবা ডিঙি। পানি পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে পারছেনা সন্তানেরা। সবমিলিয়ে মানবেতর অবস্থার মধ্যে রয়েছি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের প্রায় ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

এবিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, গত শুক্রবারের তুলনায় পদ্মার পানি আরও বেড়েছে। এতে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।

ভূক্তভোগী বন্যার্তদের অভিযোগ, পানি বৃদ্ধির পর দূর্গত মানুষের দূর্ভোগ বাড়লেও এখন পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি তাদের মাঝে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাত্র ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা অফিস থেকে ছাড় না হওয়ায় অসহায় বানভাসীদের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ ও চিলমারী ইউনিয়নের পুরো এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। এবারের বন্যায় দুই ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি। গত বুধবার দুর্গত এলাকায় গিয়ে ৩৫০ পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে আরো ত্রাণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শিগগিরই পানিবন্দী ও দুর্গত মানুষের মধ্যে সরবরাহ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত) পদ্মা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার।

বানভাসী মানুষের দাবি, দূর্ভোগ লাঘবে ও অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে সরকারসহ বিত্তবান এগিয়ে আসতে হবে।