স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
গাজীপুরে একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণে বাড়ছে চিকিৎসা চাপ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন মোট ৩ হাজার ৭৩৯ জন। এর মধ্যে হামে ২ হাজার ৫২৮ জন এবং ডেঙ্গুতে ১ হাজার ২১১ জন। এ সময়ে দুই রোগে মোট ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৭৩ জন।
হাসপাতালের পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, 'হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে হামে আক্রান্ত নতুন রোগীদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরাও প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন। তবে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ফলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।'
তিনি বলেন, 'হাম ও ডেঙ্গু-দুই রোগের ক্ষেত্রেই রোগী ও স্বজনদের সচেতন থাকা জরুরি। জ্বর, র্যাশ, সর্দি-কাশি কিংবা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।'
হামে ২,৫২৮ ভর্তি, মৃত্যু ৫---
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৫২৮ জন। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ৪৫৭ জন। এ সময়ে হাম আক্রান্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৬৬ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত ২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জন শিশু এবং তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক। একই সময়ে ১৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
হাসপাতাল পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, 'সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবেও হামে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।'
ডেঙ্গুতেও প্রতিদিন নতুন রোগী---
চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২১১ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৮ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং ১০৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করা হয়েছে। ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ৪৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে সাতজনকে রেফার করা হয়েছে এবং ৩৭ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
ডেঙ্গুতে ভর্তি ১০৩---
৩১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫৮ জন, নারী ২৯ জন এবং শিশু ১৪ জন। পুরুষদের মধ্যে এ ক্যাটাগরিতে ৪৪ জন এবং বি ক্যাটাগরিতে ১৪ জন রয়েছেন। নারী রোগীদের মধ্যে এ ক্যাটাগরিতে ১৬ জন ও বি ক্যাটাগরিতে ১৩ জন। এছাড়া বি ক্যাটাগরির কেবিনে দুজন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
একদিনে দুই রোগে ৭৩ নতুন ভর্তি---
হাসপাতালের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে একদিনে ৭৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত ২৭ জন এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪৬ জন।
অন্যদিকে, একই সময়ে দুই রোগে মোট ৫২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তাদের মধ্যে হামে ১৫ জন এবং ডেঙ্গুতে ৩৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় দুই রোগেই কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
গত বছর ডেঙ্গুতে ভর্তি প্রায় ৫ হাজার---
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৪ হাজার ৯৮৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়, ৫১৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয় এবং ৪ হাজার ৪৪৮ জনকে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
চলতি বছরের আট মাসে ডেঙ্গুতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা গত বছরের মোট সংখ্যার তুলনায় কম হলেও প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে আসায় পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
চিকিৎসাসেবা অব্যাহত, সতর্ক থাকার পরামর্শ---
হাসপাতাল পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, 'রোগীর চাপ থাকলেও চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।'
তিনি রোগী ও স্বজনদের উদ্দেশে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'হাম ও ডেঙ্গু-দুই রোগের ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জ্বর ও হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একইভাবে জ্বর হলে ডেঙ্গুর সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।'
হাসপাতালের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে একদিকে হামে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশুদের আধিক্য, অন্যদিকে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে গাজীপুরে একই সঙ্গে দুই সংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তবে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।