খুলনা ব্যুরো

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পৃথিবীতে নবী-রাসুলদের আগমন, আসমানি কিতাব ও মিজান বা মানদণ্ড দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র মানবজাতিকে সুবিচার ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শের পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও। গতকাল রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে সীরাতুন্নবী (সা.) সিম্পোজিয়াম-২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট শাহ আলমের পরিচালনায় আলোচনা করেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও খুলনা অঞ্চল জামায়াতের টিম সদস্য মাস্টার শফিকুল আলম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, খুলনা নেছারিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. শাহ আলম, সাবেক উপ সচিব স ম আবু তালেব, খুলনা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহিল গালিব ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল গফ্ফার প্রমুখ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত অসংখ্য নবী-রাসুলকে আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁদের কাছে সুস্পষ্ট বয়ান বা বায়্যেনাহ, কিতাব ও মিজান দেওয়া হয়েছে। মিজানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মিজান অর্থ মানদন্ড। সাধারণভাবে এর বাংলা অর্থ দাঁড়িপাল্লা করা হলেও এখানে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, ইনসাফ-জুলুম, ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মানদন্ড বোঝানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই মানদন্ডের চূড়ান্ত রূপ হলো আল কুরআন।

সূরা হাদীদের ২৫ নং আয়াতের ‘লিইয়াকুমান নাসু বিল কিসত’ অংশের ব্যাখ্যা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘কিসত’ অর্থ সুবিচার বা ইনসাফ। আর ‘নাস’ অর্থ মানুষ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়নি; বরং সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে।

তিনি বলেন, সমস্ত মানবজাতি যেন সুবিচারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এ কারণেই বায়্যেনাহ, কিতাব, রাসুল ও মিজান পাঠানো হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রবিউল আউয়াল মাস এলেই শুধু সীরাতের আলোচনা করা যথেষ্ট নয়। বছরের ১২ মাসই রাসুলের জীবন, দর্শন, আইন, বিধান ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শুধু একটি মাসে সীরাত আলোচনা করে বাকি সময় নবীর আদর্শ ভুলে থাকলে তাঁর জীবন থেকে প্রকৃত শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, উত্তম আদর্শ তো আর শুধু এই এক মাসে নয়, ১২ মাস। ১২ মাসেও যদি আদর্শের চর্চা না হয়, আদর্শের জ্ঞান না হয়, আদর্শের ক্লাস না হয়, তাহলে আমি কী করে নবীর আদর্শের রূপ দেব?

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শক্তির বিষয়টিও যুক্ত। তাঁর ব্যাখ্যায়, হাদীদ বা লোহা শক্তির প্রতীক। লোহা দিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, এই জাস্টিস, এই সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটা পাওয়ার প্রয়োজন হয়। লোহা শক্তির প্রতীক। রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি ঠিক রাখা এবং সমাজে আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয়, আবার মানুষের কল্যাণও নিশ্চিত করতে হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কি জীবনের সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নবুওয়াত লাভের আগে ৪০ বছর এবং নবুওয়াতের পর মক্কায় ১৩ বছর ও মদিনায় ১০ বছর মোট ৬৩ বছরের জীবনে রাসুলের জীবন ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম ও পরীক্ষায় পূর্ণ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মক্কার ১৩ বছরের সংগ্রামে সাহাবিরা নির্যাতন সহ্য করেছেন, অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল্লাহর একত্ববাদ, হেদায়েত, কিতাব ও মিজানের শিক্ষা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরিবারের শিআবে আবি তালিবে অবস্থানের ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মক্কার কাফেররা রাসুল ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ করে দিয়েছিল। খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাঁদের চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ অবরোধের সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় নবী পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে শিশুদের খাদ্য ও পানির জন্য হাহাকার এবং অনাহারে থাকার বিভিন্ন বর্ণনাও উঠে আসে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মেরাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান এবং বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তাঁর ভাষ্য, এই ঘটনার মাধ্যমে নবীর মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা তৈরি হয় এবং তিনি দাওয়াত ও সংগ্রামের পথে আরও শক্তভাবে এগিয়ে যান।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষায়, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আসমান সত্য, জমিন সত্য, কেয়ামত সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য এই মহাসত্য যে বাণী তোমার মাঝে দিয়েছি, তুমি এর পথেই মানুষকে ডাকতে থাকো।