কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে অগ্নিকান্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ চারজনের মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দুটি পরিবারের স্বজনরা। বাবা দিলীপ দত্ত ও মা স্বপ্না দত্তের কান্না থামছে না; স্বজন, প্রতিবেশী ও কুষ্টিয়ার সাংবাদিক মহলেও নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

তবে মরদেহগুলো কখন নাগাদ কুষ্টিয়ায় পৌঁছাবে, সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত স্পষ্ট সময় জানা যায়নি। কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন, সেখানে অবস্থানরত স্বজন এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে সম্ভব না হলে শনিবার মরদেহ পাঠানো হতে পারে।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ বলেন, সব কাগজপত্র তখনো প্রস্তুত হয়নি। এ কারণে মরদেহ পাঠাতে বিলম্ব হচ্ছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে মরদেহগুলো পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশে আনার কথা রয়েছে।

কলকাতার সাংবাদিক সুজিত দুয়ারী জানান, অগ্নিকান্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ একসঙ্গে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। নিহতদের মধ্যে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার রেবতী সরকারও রয়েছেন। তাঁর ছেলে ভারতের উত্তরাখন্ড থেকে কলকাতায় পৌঁছানোর পর মায়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হওয়ার কথা। ফলে শুক্রবার সন্ধ্যার আগে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তিনি জানান।

এদিকে, কলকাতায় অবস্থানরত দেবাশীষ দত্তের স্বজন ফিরোজ হাসান নিজ খরচে দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মীন, শিশুপুত্র শর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর মো. আকরাম আলীর মরদেহ দ্রুত দেশে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও যৌথ প্রক্রিয়া অনুযায়ী মরদেহ বুঝে নিয়ে দেশে ফেরার পক্ষেই অবস্থান করছেন পরিবারের সদস্যরা।

বুধবার ভোরে শিখা ইন হোটেলে আগুন লাগার ঘটনায় মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশি নিহতরা হলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, শিশু ছেলে শর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর মো. আকরাম আলী; সাভারের আমিনবাজার এলাকার আহম্মেদ বাবু; এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার আলিমুজ্জামান সাজু ও রেবতী সরকার।

কলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে মরদেহগুলো হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করায় শ্বাসরোধে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।

দেবাশীষ দত্ত স্ত্রী আফসানার চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট ভারত যান। কলকাতা হয়ে স্ত্রী, শিশু ছেলে ও শ্বশুরকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে তাঁরা কলকাতায় ফেরেন। বুধবার সকালের ফ্লাইটে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু মঙ্গলবার দিবাগত রাতের অগ্নিকান্ডে একই পরিবারের চারজনের জীবনাবসান ঘটে।

অগ্নিকান্ডের ঘটনায় কলকাতার নিউ মার্কেট থানায় মামলা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্ত দল—এসআইটি—ঘটনার কারণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা, অনুমোদন ও সম্ভাব্য অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। শিখা ইন হোটেলের লিজহোল্ডার আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর নিউ মার্কেট সংলগ্ন বাংলাদেশি পর্যটক অধ্যুষিত মারকুইস স্ট্রিটে অগ্নিনিরাপত্তা অভিযান জোরদার করেছে কলকাতা প্রশাসন। নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে হোটেল সম্রাট ও ইছামতিসহ আটটি আবাসিক হোটেল সিলগালা করা হয়েছে এবং আরও ২৮টি হোটেলকে নতুন অতিথি না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি হোটেলকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে বলে কলকাতার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন চারজনের মরদেহ দাফন ও সৎকারের জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া জেলা পরিষদ থেকেও পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। চিকিৎসার আশায় শুরু হওয়া একটি পরিবারের ভারতযাত্রা শেষ হলো চারটি মরদেহ ফেরার প্রতীক্ষায়।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী, শিশুপুত্র ও শ্বশুর আকরাম আলীকে শেষবারের মতো দেখতে এখন কেবল অপেক্ষায় কুষ্টিয়াবাসী। তাদের লাশ কুষ্টিয়াতে আসতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এ দাবী কুষ্টিয়াবাসীর।