একেএম আবদুর রহীম, ফেনী সংবাদদাতা : বছরের পর বছর ভারতীয় পাহাড়ী ঢলে প্লাবিত হয়ে আসছে ফেনীর ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া। পানির চাপে নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রতি বছরই দেখা দেয় বন্যা। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে গত বছরের আগস্টে।

বন্যায় জেলার সবক’টি উপজেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। অন্তত ২৯ জনের প্রাণহানি হয়। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় সব প্রতিষ্ঠান। দেশী-বিদেশী সহায়তার পরও এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি জেলার উৎপাদন খাত। তবে ভয়াবহ বন্যার পরও গতানুগতিক ও বাঁধ সংস্কার থেকে বের হতে পারেনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। আসন্ন বর্ষা ও বন্যার মৌসুম সামনে রেখে এবারো দায়সারাভাবে সংস্কার ও পূর্ণনিমাণ করা হচ্ছে বাঁধ। স্থানীয়রা বলছেন বাঁধ টেকসই হলে বছর বছর পাউবো কর্মকর্তা, ঠিকাদার মিলে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হবে না। তাই বাঁধ প্রতি বছর মেরামত হয় প্রতিবছর ভারতীয় পাহাড়ী ঢলে ভেঙে যায়।

এবার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৯৬টি ভাঙনস্থল মেরামত করছে পাউবো। এছাড়া ছয়টি প্রকল্পের মাধ্যমে বল্লারমুখা, তুলাতলী ও অলকা গ্রামে ৫১০ মিটার বাঁধ নির্মাণকাজ করছে।

অবশ্য স্থানীয়রা বলছেন, ২০১৮-২৪ সাল পর্যন্ত গত সাত বছরে বাঁধ মেরামতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এমন গতানুগতিক সংস্কার প্রতি বছরই হয়। আবার সংস্কার করা স্থান ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়। বাঁধ মেরামতে এবারো ব্যতিক্রম কিছু দেখছে না তারা। এ কারণে আবার বড় বন্যার আশঙ্কা করছে নিম্নাঞ্চলের মানুষ।

পাউবোর কর্মকর্তারাও বলছেন, এ ধরনের সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রমের পর ছোট বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও গত বছরের আগস্টের মতো বড় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণে এখানে টেকসই বাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে উৎপত্তি হওয়া মুহুরী ও কহুয়া নদী দুটি ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। পরশুরাম ও ফুলগাজীতে মুহুরী নদীর দৈর্ঘ্য ৬৮ কিলোমিটার ও কহুয়া নদীর দৈর্ঘ্য ১৭ কিলোমিটার। এছাড়া ফুলগাজী, পরশুরাম, ফেনী সদর ও দাগনভূঞা এলাকায় ৩৪ কিলোমিটার সিলোনিয়া নদী রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পরশুরাম উপজেলার অলকা, তুলাতলী ও নিজ কালীকাপুর এলাকা দিয়ে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা প্রতিরোধে ১৯৮৫-৮৬ সালে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পাশে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপর কয়েক বছর বন্যার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারলেও বাঁধ ভেঙে ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতি বছর কমবেশি বন্যার কবলে পড়ে ফুলগাজী ও পরশুরামের মানুষ। ২০০৪ সালে ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে কয়েক বছর বন্যা থেকে মুক্তি পায় স্থানীয়রা। তবে ২০১৩ সালে ফের বাঁধের তিনটি স্থান ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়। ওই বছর ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধ মেরামত করে পাউবো। এর পর থেকে প্রতি বছরই বাঁধ মেরামত করা হচ্ছে।

পাউবোর তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে বাঁধের ২২টি স্থানে ভাঙন মেরামতে ব্যয় হয় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে ভাঙন ছিল ১৫টি স্থানে। এগুলো মেরামতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২০ সালে ২২টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। মেরামতে ব্যয় হয় দেড় কোটি টাকা। পরের বছর ২০২১ সালে ২১টি স্থানের ভাঙন মেরামতে ব্যয় হয় ২ কোটি ১৩ লাখ। ২০২২ সালে ছয়টি স্থানের ভাঙন মেরামতে ব্যয় হয় ৭১ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে নয়টি স্থানের ভাঙন মেরামতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রথম দফায় ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে কিছু স্থানের বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। সেগুলো মেরামতে ব্যয় হয় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপর আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। মেরামতকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।

সম্প্রতি ফুলগাজী ও পরশুরামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মুহুরী নদী রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। কিছু কিছু ভাঙনস্থলে এখনই মাটি নদীর দিকে সরে গেছে। কোথাও গাছের গুঁড়ি ও বালি ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোথাও শুধু মাটি আর বালি দিয়েই বাঁধের ভাঙনস্থল ভরাট করে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে মির্জানগর ইউনিয়নের নিজ কালিকাপুর গ্রামের বল্লারমুখা বাঁধ পুনর্নির্মাণ চলছে। বাঁধ নির্মাণ থেকে মেরামত পর্যন্ত বন্যা প্রতিরোধে চলমান কোনো কাজই টেকসই হচ্ছে না বলে স্থানীয়রা অভিমত দিয়েছেন।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বন্যার পর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ভাঙনকবলিত ৯৬টি স্থান সংস্কার হয়েছে। জরুরি মেরামত কার্যক্রমে ফুলগাজীতে ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার ও পরশুরামে ৪ কোটি ২০ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে ছয়টি স্থানে ভাঙন বন্ধকরণে বাঁধ নির্মাণ চলমান। এর মধ্যে নিজ কালিকাপুর এলাকার ভারত সীমান্তবর্তী বল্লারমুখা বাঁধ ব্লক, বস্তা ও মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ২৬০ মিটার এ বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অলকা গ্রামে ৩ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৫৮ মিটার বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। তুলাতলীতে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে ৯২ মিটার বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। বাঁধের ভাঙনকবলিত ৯৬টি স্থান মেরামত শেষ হলেও ছয়টি প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘পরশুরাম ও ফুলগাজীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন পর্যন্ত গিয়েছিল। এর মধ্যে জেলায় বড় বন্যা হওয়ায় ওই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।