পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কৃষক ছানোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় এক নারীসহ ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও আট মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. ইকবাল হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, সলঙ্গা থানার চর বেড়া গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে মানিক হোসেন ওরফে হীরা মানিক, একই গ্রামের আমজাদ হোসেন আকন্দের ছেলে মাহমুদুল হাসান নয়ন, ইসমাইল হোসেন আকন্দের ছেলে রুবেল মিয়া, ছোলায়মান হোসেন আকন্দের ছেলে শরিফুল ইসলাম, চর গোজা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন এবং রামারচর গ্রামের মো. মোন্নাফের ছেলে শাহাদত হোসেন।

আদালতের রায়ে দণ্ডিতদের বিচারকালীন হাজতবাস সাজা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর শাকিল মোহাম্মদ শরিফুল হায়দার।

মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সলঙ্গা থানার চর গোজা গ্রামের কৃষক ছানোয়ার হোসেনের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী চর বেড়া গ্রামের মানিক হোসেন ওরফে হীরা মানিকের বন্ধুত্ব ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্রে হীরা মানিক ছানোয়ারের কাছ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা ধার নেন। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বসতবাড়ির সম্পত্তি নিয়ে ছানোয়ারের ভাসুরের স্ত্রী রাবেয়া খাতুনের সঙ্গেও বিরোধ চলছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২০ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে মোবাইল ফোনে ছানোয়ার হোসেনকে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাননি। কয়েক দিন পর উল্লাপাড়া উপজেলার সূর্য নদীতে বস্তাবন্দি অবস্থায় একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

মরদেহটি পচে-গলে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রথমে স্বজনরা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। পরে নিহতের দুই ছেলে রিফাত ও সিফাতের সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি ছানোয়ার হোসেনের বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ছানোয়ার হোসেনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া যায় বলে আদালতসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সেলিনা খাতুন বাদী হয়ে সলঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় হীরা মানিকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়।

তদন্ত শেষে পুলিশ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে আদালত ছয় আসামিকেই হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং রোববার তাঁদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শাকিল মোহাম্মদ শরিফুল হায়দার রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন পর হত্যার বিচার হওয়ায় মামলাটির রায়ে নিহতের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।