মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ফটিকছড়ি : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নলকূপে পানি উঠছে না। খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলার দুই পৌরসভাসহ সবকটি ইউিয়েনের দুই তৃতীয়াংশ গ্রামে নলকূপে পানি উঠছে না। বছর পাঁচেক আগেও যেসব এলাকায় পানি ছিল সহজলভ্য, এখন সেখানেই তীব্র সংকট। এখানে অসংখ্য ছড়া, খাল ও নদী থাকার পরও চলছে পানির জন্য হাহাকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে পানি তোলার কারণে ক্রমাগত নামছে পানির স্তর। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি কমেছে। ফলে গ্রামের মানুষকেও এখন তৃষ্ণা মেটাতে টাকা খরচ করতে হচ্ছে। লাগামহীন পানি তোলা বন্ধ না হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও হালদা-ধুরুং নদীর চর শস্যের অন্যতম ভাণ্ডার। গত কয়েক বছরে রবিশস্য ছেড়ে বোরো ধান চাষে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। শুষ্ক মৌসুমে ধান আবাদই এখন উপজেলার জন্য অভিশাপ। খাল-বিল-ডোবায় ভরপুর মিঠাপানির রাজ্যে এখন হাহাকার। ধান চাষে ভূগর্ভের পানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে নলকূপে উঠছে না পানি। পরিকল্পনা ও অনুমোদন ছাড়াই চাষিরা এক-দেড় হাজার গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচকাজে ব্যবহার করছেন। এর প্রভাবে উপজেলাজুড়ে পানির হাহাকার চলছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাবে, এখানে আড়াই হাজারের বেশি গভীর সেচ পাম্প রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে রয়েছে ২৫০টি। চাষিরা ব্যক্তিগতভাবে তিন হাজারের বেশি পাম্প বসিয়েছেন। একটি গভীর নলকূপে প্রতি ঘণ্টায় দেড় হাজার কিউসেক পানি উঠে। গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে দ্রুত নামছে স্তর। ফলে গত পাঁচ বছরে অন্তত ১০ ফুট নেমেছে পানির স্তর।
বিএনপি নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন ফটিকছড়ি পৌরসভার প্রায় এলাকায় পানির সমস্যা। এলাকাবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
এডভোকেট এমরান সরকার বলেন, দাঁতমারা ইউনিয়ন কোন নলকূপে পানি নেই।
দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সাজিব বলেন, বাড়ির নলকূপসহ এলাকার কোথাও পানি নেই। ফলে নিত্য ব্যবহার্য্যের কাজে পানির অভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় দূর-দূরান্ত থেকে পানি এনে গৃহস্থালীর কাজ সারা হচ্ছে।’ উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি সোলাইমান আকাশ বলেন, ‘পানির অপচয় রোধ করতে হবে। প্রচুর গাছপালা লাগানো, নদী ও খালবিলের গভীরতার পাশাপাশি সংখ্যা বাড়ানো দরকার। যেন বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন জমা থাকে এবং কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়।’
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার যে সব অঞ্চলে তীব্র পানির সংকট সেখানে আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। শীঘ্রই সেচপাম্পগুলো ব্যবহারে নীতির আওতায় আনা হবে।’উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আগে আমনের পাশাপাশি রবি ফসল হতো। ইদানিং সেখানে পানিনির্ভর বোরো হচ্ছে। এ চাষাবাদ পুরোটাই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। অন্যদিকে গড় বৃষ্টিপাত কমেছে। পানি উত্তোলন বেড়েছে। আবার বৃষ্টি কমে যাওয়ায় মাটির নিচে পানির পুনর্ভরণ হচ্ছে না। এ জন্য পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকলে শিগগির পানিশূন্য অবস্থা তৈরি হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, উপজেলার বিভিন্নস্থানে তীব্র পানি সংকটের খবরে উপজেলার জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রকৌশলীদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। তীব্র পানি সংকট মোকাবিলায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে আর্টিসিয়ান কূপগুলিতে গেইট ভালব স্থাপন করে পানির অপচয় রোধ করা, একাজটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এবং সচেতন নাগরিকবৃন্দ দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করবেন।
২০-৩০ টি পরিবার একত্রিত হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে আবেদন করলে জরুরি ভিত্তিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ জরিপ করে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করবেন।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহায়তায়, আশা করছি, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।