যশোরে শিক্ষা প্রশাসনের নাকের ডগায় চলতে থাকা কোচিং বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করানোর ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে নীলগঞ্জ এলাকার প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ‘ড্রিম টাচ’ নামে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কোচিংকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা, প্রশ্নফাঁস এবং অনৈতিক চাপ সৃষ্টির মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নীলগঞ্জ ব্রিজ সংলগ্ন একটি তিনতলা ভবন ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই কোচিং সেন্টার। বাইরে থেকে এটি স্কুল না কোচিং—তা বোঝা কঠিন। এখানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৬০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে একই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন শিক্ষক যুক্ত আছেন। তারা ক্লাসে সরাসরি শিক্ষার্থীদের বলেন, ভালো ফল করতে হলে নির্দিষ্ট কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে হবে। এমনকি কোচিংয়ে ভর্তি না হলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে সেখানে ভর্তি হচ্ছে, যা তাদের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে ভর্তি না হলে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই শিক্ষার্থী বিষয়টি তার ম্যাজিস্ট্রেট মামাকে জানালে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে ফোন করেন। পরে পরিচয় জানার পর শিক্ষক ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলে জানা গেছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, পরীক্ষার আগে ‘সাজেশন’ দেওয়ার নামে কোচিং সেন্টারে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, কোচিংয়ে যে প্রশ্নগুলো বোর্ডে লিখে পড়ানো হয়, পরদিন পরীক্ষায় সেগুলোই হুবহু আসে। এতে কোচিংয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বেশি নম্বর পায় এবং অন্যরা পিছিয়ে পড়ে। ফলে কোচিং নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে এবং মেধার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমাকান্ত বিশ্বাস জানিয়েছেন, তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কোচিং বন্ধ করতে বলেছেন, কিন্তু তারা তা মানেননি। প্রশ্নফাঁস ও হুমকির বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন বলে উল্লেখ করেন।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারেন না। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া বা এমপিও বাতিলের বিধান রয়েছে। তবুও শিক্ষা বোর্ড ও জেলা শিক্ষা অফিসের নিকটবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন কার্যক্রম চলতে থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষক মাসুদুর রহমান বলেন, তিনি কেবল পার্ট-টাইম শিক্ষক হিসেবে কোচিংয়ে ক্লাস নেন, এর বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুল হোসেন জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।