সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ভোলার জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মী বিবি সাওদা অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এ ঘটনাকে ঘিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ভোলার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৌরভ রায় মিঠুর আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আসামীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ উল্লাহ। বিবি সাওদা ভোলা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী। জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, অসুস্থ সন্তানকে রেখে তাকে দুই রাত কারাগারে থাকতে হয়েছে। তার দাবি, তিনি কেবল জনগণের মনের কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, “নিজের মতামত প্রকাশ করাই যদি অপরাধ হয়, তাহলে মানুষের মৌলিক অধিকার কোথায়? আমি চাই না আর কাউকে এভাবে কষ্ট পেতে হোক।” তার অভিযোগ, মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত হলে দেশে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আসামীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, মামলায় সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা ধারা উল্লেখ না থাকায় আদালত জামিন দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, “উপর মহলের নির্দেশে” তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং মামলার আইনি ভিত্তি দুর্বল। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের ওয়েস্টার্ন পাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তাকে আটক করে। পরদিন তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়।
পুলিশের দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়, বিবি সাওদা তার ফেসবুক আইডির মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট করেছেন, যা সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় তদন্তযোগ্য অপরাধ হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত যাচাই সম্ভব না হওয়ায় তাকে ৫৪ ধারায় আটক করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় মহলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—সমালোচনামূলক মত প্রকাশ কি অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত, নাকি এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমে মতপ্রকাশের ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই এর সীমা ও স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। ভোলার এই ঘটনাও সেই চলমান আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। সরকারের সমালোচনা মূলক ফেসবুক পোস্ট করে গ্রেফতার হলেন জামায়াতের নারী কর্মী: ভোলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রতিবাদী সংবাদ সম্মেলন ফেসবুকে সরকারবিরোধী লেখালেখি ও পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার আইনের মামলায় এক নারী কর্মীকে গ্রেফতার ও কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে ভোলায় সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জেলা শাখা। গত সোমবার (৬ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে দলটির নেতারা ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ভোলা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ একাডেমি সড়কের যমযম টাওয়ারের তৃতীয় তলায় নিজ বাসা থেকে শনিবার (৫ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে জামায়াতের নারী কর্মী বিবি সাওদা (৩৭)-কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে একটি সাইবার মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা হারুন অর রশিদ, জেলা সেক্রেটারি মাস্টার জাকির হোসাইনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় জেলা নায়েবে আমির ও ভোলা-সদর আসনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যক্তি তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে পারে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু মত প্রকাশের অভিযোগে কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য হুমকিস্বরূপ।
তারা অভিযোগ করেন, কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘উর্ধ্বতন নির্দেশের’ কথা জানিয়েছে। “এই নির্দেশ কার, কার ইশারায় তাকে গ্রেফতার করা হলো—তা জাতির সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন,”—বলেন নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গ্রেফতারকৃত বিবি সাওদার তিন বছর বয়সী একটি বাকপ্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুটির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে বিবি সাওদার মুক্তির দাবি জানান এবং অন্যথায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন।