ক্স পাম্পের আশে পাশে সড়কে তীব্র যানজট
দিন দিন দীর্ঘতম হচ্ছে পেট্রোলপাম্পে বিভিন্ন যানবাহনের জন্য তেল সংগ্রহে আসা মানুষের লাইন। তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও অনেকে তেল পাচ্ছেনা। বরং লাইনে দাড়নোর নিয়ে অহরহ ঘটছে মারামারির ঘটনা। তেল নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে পাম্পের কর্মী ও লাইনে থাকা চালকদের বিভিন্ন স্থানে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে কয়েকটি পেট্রোলপাম্পে।
দুই দিন ধরেই রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য ঘুরছেন মোটরসাইকেলের চালক ইমরান হোসেন। তিনি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন। ফলে এই দুই দিন ধরে কোনো যাত্রীই পরিবহন করতে পারেননি ইমরান।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে যখন এই চালকের সঙ্গে কথা হয়, তখন তাঁর সামনে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল তেলের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। এদিকে পাম্পের মালিক জানান সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে পাম্পের কর্মী ও লাইনে থাকা চালকদের তিনবার মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছি। এখনো তেল নিতে পারিনি। তেল পাব কি না, জানি না। আল্লাহ ভাগ্য রাখলে হয়তো পাব। কিন্তু ভোগান্তি অনেক। এই দুই দিন অফ ডে যাচ্ছে। একটা ভাড়াও নিতে পারিনি।’
রাইডশেয়ার চালক মাহফুজ আলম বলেন, রামপুরার হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই তেল শেষ হয়ে যায়। এরপরে মহাখালী, তেজগাঁও, আসাদগেট এলাকায় ১০টির বেশি স্টেশন ঘুরি। বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকার কারণে বন্ধ দেখতে পাই। বাকি যেগুলো চালু ছিল সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইন। ফলে তিনি আর লাইনে দাঁড়াননি।
রাজধানীর মৎস্যভবন মোড়ে রমনার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ান বলে জানান মহিবুল হক। সেখানে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এরপরও ডিপো থেকে তেল না আসতে দেখে লাইন থেকে বের হয়ে পরীবাগে অবস্থিত মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে যান। সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখে আর দাঁড়াননি। চলে আসেন মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে।
এই মোটরসাইকেলের চালক বলেন, ‘আগে একটি ওষুধ কোম্পানিতে জব করতাম। সেটি ছাড়ার পর নতুন চাকরি খুঁজতেছি। আপাতত না পেয়ে রাইড শেয়ার করি। কিন্তু এখানে এসে পড়লাম চরম ভোগান্তিতে। শুধু আমি না, লাখ লাখ বাইকার এই ভোগান্তির শিকার। কিছু তো আর করার নাই।’
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তেল না পাওয়া চালকের সংখ্যা অনেক। বেলা ১টার সময় রাজধানীর আরামবাগে অবস্থিত মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে কথা হয় প্রাইভেটকারের চালক মোহাম্মদ সুলতানের সঙ্গে। তিনি জানান, ফিলিং স্টেশনে ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তেল পাননি।
বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন :
তিনটি ফিলিং স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে বৃহস্পতিবার পুলিশ মোতায়েন করতে দেখা গেছে। বেলা ১টার দিকে আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে লাইন অতিক্রম করে তেল নেওয়ার চেষ্টা করা কয়েকজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে দিতে দেখা গেছে।
বেলা ২টার সময় মতিঝিলের করিম ফিলিং স্টেশনেও লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা গাড়িগুলোকে পুলিশ সরিয়ে দেয়। এই ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুস সালাম জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনবার পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে চালকদের ও লাইন অতিক্রম করা নিয়ে চালকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘এসব এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পুলিশ সদস্যরা আছেন। তাঁরা শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছেন।’
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সারি, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রাইভেট কার ও বাইক চালকদের। সড়কের একাংশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তেলের লাইনে যুক্ত হচ্ছে শত শত যানবাহন, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের প্রতিটি মোড়ে। এই লাইনগুলো সরাসরি সড়কের অংশ দখল করে ফেলায় যান চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়ছে এবং আগের চেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে যানজট। ফলে কর্মজীবী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন না কর্মস্থলে, শিক্ষার্থীরা আটকে পড়ছে সড়কে, জরুরি সেবাও পড়ছে বিলম্বের মুখে। ভোগান্তির মাত্রাও চরমে পৌঁছেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে জ্বালানি সংকটকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি এখন সরাসরি ট্রাফিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, মহাখালী, মিরপুর, তেজগাঁও, খিলক্ষেত ও উত্তরা; প্রায় প্রতিটি এলাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক দীর্ঘ যানবাহনের সারি নতুন করে তীব্র যানজটের জন্ম দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ভোর, কোনো কোনো সময় রাত থেকে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে সংখ্যায় অল্প হলেও আছে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। অনেক ক্ষেত্রে এই সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে পাশের লেন দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও লাইনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি যান চলাচলের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও মহাখালী-সংলগ্ন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি জটিল। এখানে ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি নিতে অপেক্ষমাণ গণপরিবহন সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে রাখছে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারছে না অন্য যানবাহন। ধীরগতির এই চাপ দ্রুতই দীর্ঘ যানজটে রূপ নিচ্ছে এবং আশপাশের সড়কগুলোতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
একই চিত্র গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও দেখা গেছে। অফিস সময়কে কেন্দ্র করে যখন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে, তখন ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে করে কয়েকশ মিটার এলাকার যানজট দ্রুত কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
খিলক্ষেতের ফিলিং স্টেশনের লাইন ঠেকে যাচ্ছে জিয়া কলোনি পর্যন্ত। আবার তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত। ফলে বিমানবন্দর হয়ে উত্তরার দিকে যেতে সময় লাগছে বেশি। অন্যদিকে মহাখালী থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার কারণে বাসের দৈনিক ট্রিপ কমে যাচ্ছে। এতে সড়কে চলাচলরত বাসের সংখ্যা সাময়িকভাবে কমে গেলেও যেসব বাস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোই উল্টো সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট কমার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীরাও পড়ছেন দ্বিমুখী ভোগান্তিতে। একদিকে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যে বাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও যানজটে আটকে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগছে কয়েকগুণ বেশি সময়। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন একই পরিস্থিতিতে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। নির্দিষ্ট লেন বা আলাদা সারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহন সরাসরি মূল সড়কে প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি সংকট ঘিরে সড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজটের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক সদস্যদের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্বরত বাসচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটজনিত এই পরিস্থিতিতে তারাও কম ভোগান্তিতে নেই। একদিকে যানবাহন সচল রাখতে জ্বালানি নেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যদিকে ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ালেই সড়কে তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ; এই দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন তারাও। অছিম পরিবহনের চালক মোস্তফা বলেন, তেল না নিলে গাড়ি চালানো সম্ভব না। আবার লাইনে দাঁড়াইলেও রাস্তা বন্ধ হইয়া যায়। যাত্রীরা আমাগো লগে চিল্লাচিল্লি করে। আমাগো তো কিছু করার থাকে না।
দিশারী পরিবহনের চালক আব্বাস তালুকদার বলেন, একবার লাইনে ঢুকলে কখন তেল পাওয়া যাইবো কোনো নিশ্চয়তা নাই। আমাগো গাড়ি বন্ধ কইরা বইসা থাকতে হয়। রাস্তায় চাপ বাড়ে বুঝতাসি, কিন্তু আমাগো আয়ও তো কইমা গেছে। রাস্তায় তো ট্রিপ এহন কম।