• দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান

আবদুর রাজ্জাক রানা, খুলনা ব্যুরো

দক্ষিণ জনপদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও বহুল কাক্সিক্ষত খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে নানামুখী জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তার অন্ধকারে থাকা এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এবার নতুন গতি এনেছে একটি চীনা কোম্পানির আগ্রহ। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে চীনের একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ায় খুলনাবাসীর মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘুচিয়ে অবশেষে এই বিমানবন্দরটি আলোর মুখ দেখতে পারেÑএমনটাই প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ।

বাগেরহাট জেলার রামপালের ফয়লায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নির্মাণের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বেদনাবিধূর। ১৯৯৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মহাসমারোহে খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সে সময় স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। প্রাথমিক মাটি ভরাটের কাজও সম্পন্ন হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এরপরই অদৃশ্য কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। ২০১৫ সালে নতুন করে তৎকালীন সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং ‘খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প’ নামে একটি সংশোধিত প্রকল্প হাতে নেয়। সে সময় এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের পরিধি ও আধুনিকায়নের স্বার্থে ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে বিমানবন্দর এলাকার জন্য নতুন করে আরও ৫২৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

প্রাথমিকভাবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির আওতায় বিমানবন্দরটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এসে নেতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেয়। তাদের সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকল্পটি আবারও দীর্ঘমেয়াদী স্থগিতাদেশের মুখে পড়ে। ফলে থমকে যায় খুলনার কোটি মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি।

স্থানীয় জনগণের আন্দোলন ও দাবি

সরকারি উদ্যোগে ভাটা পড়লেও বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটিসহ খুলনার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজ, বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন এবং তরুণ উন্নয়ন কর্মীরা কখনোই হাল ছেড়ে দেননি। প্রতি বছরই বিমানবন্দর নির্মাণের দাবিতে তারা নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। কখনো মানববন্ধনের মাধ্যমে রাজপথ উত্তপ্ত করা হয়েছে, কখনো আবার স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে।

দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের একটাই দাবি ছিলÑখুলনাকে দেশের অন্যান্য উন্নত অঞ্চলের সাথে সরাসরি আকাশপথে যুক্ত করতে হবে। কিন্তু বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছিল এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে।

চীনা কোম্পানির তৎপরতা এবং সাম্প্রতিক অগ্রগতি

চলতি বছরের জুলাই মাসটি খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত ২৫ জুলাই বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান এডভোকেট এস এম শফিকুল আলমের সাথে সরাসরি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন চীনা কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা বিমানবন্দরটির বর্তমান অবস্থা, ভৌগোলিক সুবিধা এবং আশেপাশের পরিকাঠামো ঘুরে দেখেন।

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা জানান, ‘গত মাসে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে চীনের একটি কোম্পানি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের প্রতিনিধিদলের সাথে আমি নিজে প্রকল্প এলাকাটি পরিদর্শন করি এবং সম্ভাব্যতা ও আন্তরিকতা যাচাইয়ের পর তাদের একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিতে বলি। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ জুলাই তারা বেবিচক চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে। এখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।" চীনা কোম্পানির এই আকস্মিক ও আন্তরিক আগ্রহ কেবল কথার কথা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে একটি শক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হতে চলেছে।

কেন প্রয়োজন খানজাহান আলী বিমানবন্দর

খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং এর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে খানজাহান আলী বিমানবন্দর শুধু একটি যাতায়াত মাধ্যম নয়, বরং গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি। এই গুরুত্বের কথা তুলে ধরে খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আসাদুর রহমান বলেন, বিমানবন্দর না থাকায় বিদেশি ক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং বড় আমদানিকারকরা সরাসরি খুলনায় আসতে চান না। যাতায়াতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেন। বিমানবন্দর চালু হলে মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটবে। তিনি বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এবং ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলনার খুব কাছেই অবস্থিত। আকাশপথের যোগাযোগ না থাকায় বিদেশি পর্যটকরা সহজে এখানে যাতায়াত করতে পারেন না। বিমানবন্দর চালু হলে বিশ্বমানের পর্যটকরা সরাসরি খুলনায় ভিড় জমাবেন। তিনি আরও বলেন, খুলনায় একটি আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম রয়েছে। অথচ পর্যাপ্ত বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এখানে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হয় না। বিমানবন্দর চালু হলে খুলনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেরও একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনা কোম্পানির আগ্রহ এবং স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বেবিচক যদি এই প্রস্তাবকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত জিটুজি বা উপযুক্ত বাণিজ্যিক কাঠামোর মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন করে, তবে দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দী থাকা এই মেগা প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে। বিমানবন্দরটি নির্মিত হলে শুধু খুলনা নয়, সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। মোংলা বন্দর ও মোংলা ইপিজেডের পূর্ণাঙ্গ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ চিরতরে লাঘব হবে। ৩০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই চীনা আগ্রহ যেন শুধুই আশ্বাস না থেকে বাস্তবে রূপ নেয়Ñএটাই এখন খুলনাবাসীর একমাত্র চাওয়া।