গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ির চত্বরের পশ্চিম অংশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়বৃক্ষ। দূর থেকে দেখলে অন্য অনেক গাছের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্য। কাণ্ডজুড়ে ফুটে থাকা অদ্ভুত সুন্দর ফুল আর ঝুলে থাকা বড় বড় গোলাকার ফল যেন গাছটিকে দিয়েছে এক ভিন্ন রাজকীয় অবয়ব। নাম তার-নাগলিঙ্গম।

ভাওয়াল রাজবাড়ি দেখতে প্রতিদিনই আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটক, দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ। রাজবাড়ির স্থাপত্য, প্রাচীন ভবন আর ইতিহাসের পাশাপাশি এই অচিন বৃক্ষটিও তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কেউ অপলক চোখে তাকিয়ে থাকেন, কেউ গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। আবার অনেকেই কৌতূহলী হয়ে জানতে চান-গাছটির নাম কী? এত বড় গোলাকার ফল কেন ধরে? ফুলের মাঝখানে সাপের ফণার মতো আকৃতি কেন? কত বছরের পুরোনো এই গাছ? কে লাগিয়েছিলেন? কী কাজে লাগে?

নাগলিঙ্গমের এমন অদ্ভুত ফুল-ফলের কারণেই গাছটি সাধারণ বৃক্ষের ভিড়ে আলাদা হয়ে ওঠে। ফুলের মাঝখানের অংশটি অনেকটা ফণা তোলা সাপের মতো দেখায়। এ বৈশিষ্ট্য থেকেই এর নাম হয়েছে নাগলিঙ্গম। ফুলে লাল, গোলাপি ও হলুদের মিশ্রণ প্রকৃতির এক অপূর্ব নকশা তৈরি করে। আর ফুলের পর গাছে ধরে বড় বড় গোলাকার বাদামি-খয়েরি ফল, যা দেখতে অনেকটা কামানের গোলার মতো। এ কারণে ইংরেজিতে এর নাম Cannonball Tree। এর বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis এবং এটি Lecythidaceae পরিবারের বৃক্ষ।

রাজবাড়ির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাওয়াল রাজবাড়ির নাগলিঙ্গমকে ঘিরে রয়েছে নানা স্মৃতি ও জনশ্রুতি। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে গাছটিকে ভাওয়াল রাজপরিবারের সময়ের স্মৃতিবাহী শতবর্ষী বৃক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় ভাওয়াল রাজবাড়িতে হাতির পাল ছিল এবং নাগলিঙ্গমের ফল হাতিদের প্রিয় খাবার ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে গাছটির সঙ্গে রাজপরিবারের জীবনযাত্রা ও রাজবাড়ির পুরোনো দিনের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।

রাজা-জমিদারদের সেই জৌলুশ নেই, নেই রাজপরিবারের ব্যস্ততা কিংবা হাতিশালার সেই দৃশ্য। সময়ের স্রোতে ভাওয়াল রাজবাড়ির অনেক কিছুই বদলে গেছে। কিন্তু নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নাগলিঙ্গমটি। যেন শত বছরের ইতিহাসের পাতা উল্টে না দিয়ে নিজের শরীরেই ধরে রেখেছে অতীতের স্মৃতি।

ফুলে বিস্ময়, ফলে কৌতূহল

নাগলিঙ্গমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর ফুল। সাধারণ গাছের ফুল যেখানে ডালে বা পাতার ফাঁকে ফুটে, সেখানে নাগলিঙ্গমের ফুল কাণ্ড ও মোটা শাখা থেকে বের হওয়া দীর্ঘ মঞ্জরিতে ফুটতে দেখা যায়। ফুলের গঠনও ব্যতিক্রমী। পাপড়ির সৌন্দর্যের সঙ্গে মাঝখানের অংশটি সাপের ফণার মতো উঁচু হয়ে থাকে। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। আর ফুল ঝরে যাওয়ার পর সেখানে দেখা দেয় গোলাকার ফল।

ফলগুলো বড় হতে হতে দেখতে অনেকটা কামানের গোলার মতো হয়ে ওঠে। এ ফলের কারণেই গাছটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ‘ক্যাননবল ট্রি’ নামে পরিচিত। নাগলিঙ্গমের ফুল যেমন মুগ্ধ করে, পাকা ফলের বৈশিষ্ট্যও তেমনি বিস্ময় জাগায়।

ভাওয়াল রাজবাড়িতে আসা অনেক দর্শনার্থীর কাছেই নাগলিঙ্গম এক অচেনা বৃক্ষ। রাজবাড়ির পুরোনো ভবন, দালানকোঠা ও স্থাপত্য দেখতে দেখতে হঠাৎ কাণ্ড থেকে বের হওয়া ফুল দেখে তারা থমকে দাঁড়ান। কাছে গিয়ে ফল দেখে বিস্মিত হন। অনেকেই গাছটির নাম জানতে চান, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি শুধু একটি সুন্দর গাছ নয়, বরং বিরল ও ঐতিহ্যবাহী একটি বৃক্ষ। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নাগলিঙ্গমের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন উদ্যান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পুরোনো স্থাপনা চত্বরে এ গাছের দেখা মিললেও ভাওয়াল রাজবাড়ির নাগলিঙ্গমের বিশেষত্ব হলো-এটি ইতিহাস ও প্রকৃতির দুই অধ্যায়কে একই সঙ্গে ধারণ করে আছে।

গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি ভাওয়াল রাজপরিবারের দীর্ঘ ইতিহাসের স্মারক। সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকা নাগলিঙ্গম বৃক্ষটিও তাই ঐতিহ্যের অংশ। একটি পুরোনো বৃক্ষ হারিয়ে গেলে শুধু একটি গাছই হারায় না, হারিয়ে যায় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু বছরের স্মৃতি ও গল্প।

তাই রাজবাড়ির স্থাপত্যের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক নাগলিঙ্গম বৃক্ষটিরও যথাযথ পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও সুরক্ষা প্রয়োজন। গাছটির পাশে এর নাম, বৈজ্ঞানিক পরিচয়, সম্ভাব্য বয়স ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব উল্লেখ করে একটি তথ্যফলক স্থাপন করা হলে দর্শনার্থীদের কৌতূহল যেমন মিটবে, তেমনি নতুন প্রজন্মও জানতে পারবে এই অসাধারণ বৃক্ষের কথা।

ভাওয়াল রাজবাড়ির চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা নাগলিঙ্গম তাই নিছক একটি বৃক্ষ নয়। রাজকীয় সেই সময়ের অনেক স্মৃতি যখন কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, তখনও নীরবে ফুল-ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার কাণ্ডে যেন লেখা রয়েছে ভাওয়ালের অতীত, তার ফুলে প্রকৃতির বিস্ময়, আর তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীদের চোখে জেগে ওঠে একটাই প্রশ্ন-কত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনও বেঁচে আছে এই নাগলিঙ্গম?