আজিজুর রহমান মশিউর : বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, দাঁড়িয়ে থাকলে শরীর কেঁপে ওঠে। কথা বলতে গেলেও জড়িয়ে আসে কণ্ঠ। তবু জীবনের কাছে হার মানেননি ১০০ বছরের বৃদ্ধা জামিলা। অভাবের সংসারে একসময় যাঁর দুই ছেলে ছিল, আজ তাঁর আপন বলতে পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সন্তান হারানোর সেই শোক বুকে নিয়েই প্রায় দুই দশক ধরে একা একা বেঁচে থাকার লড়াই করছেন তিনি।

যশোর শহরের রায়পাড়া বেলাল মসজিদের পাশে ভাড়া বাসায় থাকেন জামিলা। তবে বাড়ির মালিক ভাড়ার টাকা মওকুফ করে দিয়েছেন তার এই করুন আবস্থা দেখে । তাঁর স্বামী সাইফুদ্দিন অনেক আগেই মারা গেছেন। স্বামী হারানোর পর দুই ছেলে চান ও মান্নানকে ঘিরেই ছিল তাঁর পৃথিবী। বড় ছেলে চান কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করতেন। সামান্য আয় হলেও সেই অর্থেই মায়ের মুখে খাবার জুটত, সংসার চলত।

কিন্তু প্রায় ১৯ বছর আগে হঠাৎ সেই সংসারে নেমে আসে এমন এক অন্ধকার, যার আলো আজও ফেরেনি। চান মারা গেলেন। ছেলেকে দাফন করে শোকাহত মা যখন বাড়িতে ফিরলেন, তখনও হয়তো বুঝতে পারেননি তাঁর জন্য আরও বড় এক আঘাত অপেক্ষা করছে। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর ছোট ভাই মান্নান কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেননি। শোকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। এরপর একই দিনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মান্নানও।

একদিনেই দুই সন্তানকে হারান মা জামিলা।

একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় শোক আর কী হতে পারে? যে দুই সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বাকি জীবনটা কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিনেই সেই দুই সন্তান তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। সন্তানদের দাফন শেষে যে বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন জামিলা, সেই বাড়িটিই যেন মুহূর্তে হয়ে উঠেছিল নিঃসঙ্গতার এক বিশাল কারাগার। সেই থেকে শুরু তাঁর একার জীবনযুদ্ধ। দিন গেছে, মাস গেছে, বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু জামিলার জীবনে স্বস্তির দিন আর আসেনি। বয়সের ভার, শরীরের দুর্বলতা কিংবা অসহায়ত্ব কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। কখনো পথে পথে, কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে সামান্য রিজিকের আশায় ঘুরেছেন। কেউ এক টাকা দিয়েছেন, কেউ দু-এক মুঠো খাবার দিয়েছেন। এভাবেই মানুষের দয়া আর মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে কেটে গেছে প্রায় দুই দশক।

সোমবার (২৪ আগস্ট) যশোর শহরের প্যারিস রোডে একটি দোকানের পাশে বসে থাকা অবস্থায় দেখা মেলে জামিলার সঙ্গে। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে বোঝা যায়, বয়সের ভারে তিনি কতটা অসহায়। ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না। শরীর কাঁপছে। কথাও স্পষ্টভাবে বলতে পারছেন না। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ জীবনের সঙ্গে লড়াই করার সেই নীরব আকুতি যেন স্পষ্ট।

এই নারী এখনো বয়স্ক ভাতার দাবিদার। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাঁকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার কথা বলা হলেও বারবার শোনা যায় সামনের মাসে করে দেওয়া হবে। এভাবেই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। কিন্তু জামিলার মতো অসহায় মানুষের কাছে সামনের মাস মানে আরও একটি দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রশ্ন হলো এই অপেক্ষার শেষ কোথায়? যে নারীর জীবনে স্বামী নেই, সন্তান নেই, নেই দেখভাল করার মতো কোনো আপনজন, তাঁর শেষ বয়সের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি শুধু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়? রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার অধিকার যদি তাঁর থাকে, তবে কেন তাঁকে সেই সুবিধার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে এ প্রশ্নও এখন সামনে আসছে।

ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, জামিলার জীবনের করুণ কাহিনি সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। শেষ বয়সে তাঁর এভাবে অসহায় জীবন কাটানো আমাদের কারও কাম্য নয়। জামিলার বয়স্ক ভাতা দ্রুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।

জামিলার দাবি খুব বেশি নয়। তিনি বড় কোনো সম্পদ চান না, বিলাসী জীবন চান না। চান শুধু শেষ বয়সে দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা, মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই এবং চিকিৎসার সামান্য সুযোগ চান। কেউ তাঁকে বোঝা হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে দেখুক।

সমাজের বিত্তবান মানুষ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি তাই অনুরোধ জামিলার জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন অবহেলায় না কাটে। তাঁর বয়স্ক ভাতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এখন মানবিক দায়িত্ব।

১৯ বছর আগে একদিনে দুই সন্তানকে হারানো এই মায়ের কান্নার কোনো সাক্ষী ছিল না। তাঁর দীর্ঘ একাকিত্বেরও কোনো হিসাব নেই। কিন্তু আজ তাঁর কাঁপা শরীর, অস্পষ্ট কণ্ঠ আর অসহায় চোখ যেন সমাজের বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জামিলা কি একটু ভালোবাসা, একটু নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার সামান্য অধিকারও পাবেন না?#