মশিউর রহমান, সাদুল্লাপুর : গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ফসল উৎপাদনে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উৎপাদন খরচ। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ফসল উৎপাদনে উৎসাহ হারাচ্ছে কৃষক। প্রতিটি ফসল উৎপাদন করে অর্ধেকের বেশি লোকসান করতে হয়েছে কৃষককে। বাজারে স্বস্তি ফিরলেও অস্বস্তি বিরাজ করছে কৃষককের ঘরে বাহিরে। কৃষককের পাশে সহানুভূতি নিয়ে দাঁড়ায়নি কেউ বরং ঠকিয়েছে বারংবার। যে সকল ফসল উৎপাদন করে লোকসান গুণতে হয়েছে কৃষককে সেগুলো হলো আলু, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, সীম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, পেঁপে, করলা, পটল, বেগুন, গাজর, ক্ষিরা, বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি। সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে পরেছে নেতিবাচক প্রভাব। মৌসুম অনুযায়ী এ সকল শাক সবজি বাজারে নিয়ে এসে বিক্রি না হওয়ায় ড্রেনে, রাস্তায় ফেলে যাওয়া দৃশ্য দেখা গিয়েছে প্রতিনিয়ত। কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া বেড়েছে উৎপাদন। যুগ উপযোগী প্রশিক্ষণের অভাবে বিভিন্নভাবে সিন্ডিকেট পাটি দ্বারায় প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ কৃষক। সিন্ডিকেট চক্র বিভিন্ন কলাকৌশলে কৃষকদের নিকট থেকে কম দামে পণ্য সংগ্রহ করে বাজারে সংকট দেখিয়ে উচ্চ দামে ভোক্তাদের নিকটে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা করছে। ফসল উৎপাদনে বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার কতৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে উচ্চ দামে সার, কীটনাশক বালাইনাশক, বীজ বিক্রি করে সব ডিলা ও এজেন্সি। ফলে জীবন বাঁচাতে বাপ দাদার পেশা ধরে রাখতে উচ্চ মূল্যে বীজ, সার কীটনাশক, বালাইনাশক কিনতে হয় কৃষকদের।
কীটনাশক বালাইনাশক কিনতে গেলে কৃষককে বিভিন্নভাবে ফসলের রোগের বর্ণনা শুনে ভুলভাল বুঝিয়ে, একাধিক হরমোন, ভিটামিন, জিংক, ব্রোন, জৈব রাসায়নিক সার, ম্যাগনেসিয়া, দানাদার নামসর্বস্ব হীন কোম্পানির ওষুধ উচ্চ লাভে বিক্রি করে ব্যবসায়ী হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। এ সকল দোকানদার বা ব্যবসায়ী ডিলার, এজেন্সিরা লেখাপড়া না জেনেও কীটনাশক, বালাইনাশকের ব্যবসা ধরে কম সময়ে বেশি লাভের আশায় এক একজন হয়ে উঠেছে কৃষিবিদ সর্বজান্তা। তাদের চাটু কথায়, প্রলোভনে নামসর্বস্বহীন ওষুধ কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে সরল কৃষক। ফসলের বিভিন্ন রোগের সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় ব্যহত হচ্ছে উৎপাদন। ফসল বাঁচাতে যে যা বলছে সেই অনুযায়ী ফসলের চিকিৎসা করছে কৃষক। এতে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। কৃষকের সরলতার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট চক্র বিভিন্ন কলাকৌশল প্রয়োগ করছে প্রতিনিয়ত। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ফসলে লোকসান গুনতে গুনতে ভিটে মাটি হারাচ্ছে কৃষক। এখান থেকে বেড়িয়া আসতে না পারলে ভবিষ্যতে কৃষি ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞ মহল। কৃষক বাঁচলে ভোক্তা বাঁচবে, বাঁচবে বাংলাদেশ। কৃষিক্ষেত্রে অপচয় রোধে প্রতিটি ইউনিয়নে রয়েছে একাধিক বিশেষজ্ঞ কৃষি উপসহকারী, কৃষি তথ্য সেবা, কৃষি হটলাইন। সুকৌশলে কৃষকদের এ সকল সেবা থেকে বঞ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে চক্রের সদস্যরা। ইদিলপুর ইউনিয়নের সবজি চাষি নুলু মিয়া বলেন,আমার মরিচ গাছে পাতা কোকরানো ওষুধ কিনতে গেলে কীটনাশক ব্যবসায়ী আমার হাতে ৫ প্রকারের ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে বলে এগুলো দিলে ফসলের রোগ আর থাকবে না। আমি তাকে কয়েকটি কোম্পানির নাম ধরে ওষুধ চাইলে, সে আমাকে বলে ও কোম্পানির চেয়ে ভালো বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বাজারে নকল কীটনাশক ও বালাইনাশকের ছড়াছড়ি। তারা হকারি করে কম দামে নামসর্বস্বহীন ওষুধ ক্রয় করে বেশি দামে কৃষকের নিকট বিক্রি করছে। এসকল ওষুধ ফসলে প্রয়োগ করলে লাভ-ক্ষতি কোনটাই নেই। শুধু অর্থেরই অপচয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু না। যেখানে এক ওষুধে কাজ হয়, সেখানে তারা একাধিক ওষুধ বিক্রি করছে। মিক্সচার বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে, নামে মাত্র মূল্যে ফসল উৎপাদনের জন্য সকল কৃষি উপকরণ পাইতে পারে। তার জন্য কৃষিতে আরো সরকারকের ভর্তুকিসহ সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষক শাহজাহান আলী বলেন, এবছর আমি, ফুলকপি বাঁধাকপি ও মুলা আবাদ করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারি নাই। কৃষি ঋণ তুলতে গিয়েও পাইনি। বাধ্য হয়ে সুদের উপর টাকা নিয়ে আলুর আবাদ করে সেখানেও লোকসান। কৃষকদের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও আত্মীয়করণের কারণে তা কৃষকের নিকটে না গিয়ে সিন্ডিকেট দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে চলে যায় ব্যবসায়ীদের হাতে। কৃষকদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকেছে। এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মতিউল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা এমন চিত্র দেখেছি। কৃষকদের সঠিক পরামর্শ ও নামসর্বস্বহীন কোম্পানির এসকল কৃষিপণ্য ক্রয়ে আমরা নিরুৎসাহিত করছি। অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া মাত্র সকল প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করছি। তিনি বলেন, এলাকার কৃষিতে আধুনিকতা আয়নানের পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমাতে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতে জৈব বালাইনাশক, আলোর ফাঁদ, আঠালো ফাঁদ, এমন বিভিন্ন পদ্ধতির প্রদর্শনী প্লোট তৈরি করে উদ্বুদ্ধ করছি। কৃষকরা আমাদের সাথে কৃষি বিষয়ক যেকোন পরামর্শের জন্য যেকোনো সময় রাত দিন নেই যোগাযোগ করতে পারে। কৃষি ঋণের বিষয়ে আমরা সুপারিশ করলে ব্যাংকগুলো মূল্যায়ন তো করেই না বরং বিভিন্ন অযুহাতে হেনস্তা করার চেষ্টা করে। আমি মনে করি সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকৃত কৃষক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কৃষকদের কৃষিতে মনোনিবেশ করতে আমাদের কৃষি বিভাগ থেকে চেষ্টা কমতি নেই।