জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশের ছোড়া গুলির তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এ কথা উল্লেখ করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন ময়নাল হোসেন। বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত তিনি। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশ।
জবানবন্দির একপর্যায়ে ময়নাল বলেন, ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সকালে পরিবারের সদস্য-সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অবস্থান করি আমি। তাইমের মরদেহ সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আমার সঙ্গে দেখা করেন শাহবাগ থানার এসআই শাহাদাত। তখন পরিচয় দিয়ে তাইমকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে বলে জানাই। একইসঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলি। কিন্তু একই পেশার সহকর্মী হিসেবে কোনো সান্ত¡না না দিয়ে আরেকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি।
তাইমের বাবা বলেন, সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলেও অকারণে দেরি করতে থাকেন শাহাদাত। দুপুর ১২টার দিকে সুরতহাল করতে যান তিনি। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি- ‘আপনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন’। জবাবে এসআই শাহাদাত বলেন ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে’। এই বলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্র¯‘ত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। এতে আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই।
ময়নাল হোসেন বলেন, আমার ছেলে মারা গেছে। চাকরি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। মরদেহে প্রায় পচন ধরে গেছে। এসব চিন্তা করে সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা পার হলেও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ নিয়ে এসআই শাহাদাতের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়। কিš‘ তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি। বিকেল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সাড়ে ৪টার পর সম্পন্ন হলে আমরা তাইমের মরদেহটি বুঝে পাই।
এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তাদের আজ সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
পলাতকরা হলেন, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, মঈনুল করিমসহ অন্যরা।
শাপলা চত্বর গণহত্যা মামলায় আসামী হচ্ছেন সাবেক আইজিপি মামুন : রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর হত্যাকা-সহ র্যাবে দায়িত্ব পালনকালে কথিত ক্রসফায়ার ঘটনায় করা একাধিক মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কারা আসামি হতে যাচ্ছেন তা এখনই প্রকাশ করতে পারছি না। তবে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অনেক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পেয়েছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণ প্রতিবেদন পাওয়ার আশা করছি। এ নিয়ে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। নারকীয় এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে আমিনুল ইসলাম বলেন, পুরো পৃথিবীর মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া নারকীয় এই হত্যাকা-টি। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় যাদেরই সম্পৃক্ততা মিলবে, আমরা তাদেরই আইনের আওতায় আনবো। সিভিলিয়ান কিংবা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী- আমরা প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় নিয়ে আসবো। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। গত ৫ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী ৭ জুন দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল।
এ মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা ম-লীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল ম-ল।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ে তৎকালীন র্যাবের কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। তাকে এ মামলার আসামি করা হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদ- হয়। একই মামলায় আসামি থাকা ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ায় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়।