ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনও স্বস্তিতে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নেই শিডিউল বিপর্যয়ের কোন খবর। ঝামেলাহীন ঈদযাত্রার নতুন অভিজ্ঞতায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন যাত্রীরা। তবে, সড়কপথে যাত্রীর চাপ বেড়েছে বিকেলে।

সরেজমিনে ঘুরে বৃহস্পতিবার দেখা যায়, ঈদযাত্রার চতুর্থ দিনেও স্বস্তির চিত্র কমলাপুর রেলস্টেশনজুড়ে। যাত্রী আগের মত হলেও নেই চিরচেনা ভিড়। দেখা মেলেনি দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা গন্তব্যে পৌঁছানো কোন যাত্রীর। ঝামেলাহীন নাড়ির টানের যাত্রায় সবার মুখে স্বস্তির হাসি। স্বস্তি প্রকাশের পাশাপাশি যাত্রীরা দাবি জানান ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখার।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানান, যাত্রীদের নিরাপত্তায় স্টেশনজুড়ে নানান পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আর টিকিট কালোবাজারি রোধে বাড়তি নজরদারি করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

ট্রেনের যাত্রী থাকলেও বাস স্টেশনগুলোতে এখনও নেই যাত্রীর চাপ। রোজা-গরম আর ট্রেন যাত্রা স্বস্তিদায়ক হওয়ায় যাত্রী সংকট বলছেন বাস কাউন্টারের দায়িত্বরতরা। তবে সরকারি ছুটি শুরু হলে যাত্রী বাড়ার আশা তাদের।

এদিকে ঈদযাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে যানবাহনের বাড়তি চাপ থাকলেও যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাওয়া ঘরমুখো মানুষ নির্বিঘেœ নিজ গন্তব্য পৌঁছাতে পারছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোলপ্লাজার ২১ কিলোমিটার সড়ক পর্যন্ত কোথাও কোনো যানজটের ভোগান্তি হয়নি বলে জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দূরপাল্লাসহ আঞ্চলিক বাসগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা শেষে স্থান ত্যাগ করছে। এতে করে সড়কে যানবাহনগুলোর জটলা সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে যাত্রী এবং গাড়িচালকরাও স্বস্তিতে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটতে পারছেন।

এদিকে মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে হাইওয়ে ও থানা পুলিশ তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এরিয়ার কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে পুলিশের সহযোগিতায় র‌্যাব সদস্যদের মহাসড়কে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

গার্মেন্টসকর্মী জাহিদুল ইসলাম কুমিল্লায় যাবেন। কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি বলেন, গাড়ির যথেষ্ট চাপ দেখতে পাচ্ছি। আমাদের অফিস গত পরশুদিন ছুটি ঘোষণা করেছে। অবশিষ্ট কাজকর্ম শেষে আজ পরিবার নিয়ে ঈদ করতে গ্রামে যাচ্ছি। রাস্তায় যেহেতু যানজটের আশঙ্কা নেই, তাই মনে হচ্ছে ২ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাতে পারবো।

ব্যবসায়ী মন্টুর ধারণা এবার যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হবে না ঘরমুখো মানুষকে। তবে মহাসড়কজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা না থাকলে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের শিকার হবেন অসংখ্য মানুষজন।

কয়েকজন দূরপাল্লার বাসচালক জানান, বিগত বছরগুলোর মতো এবার মহাসড়কের কোথাও যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না তাদের। বর্তমান সময়ের মতো আগামী ৩-৪ দিন থাকলে যাত্রীদের যাত্রা স্বস্তির হবে।

মহাসড়কের পরিস্থিতির বিষয়ে শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ আবু নাঈম বলেন, এবারের ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি এড়াতে আমাদের অতিরিক্ত ফোর্স কাজ করছে। ঈদ উপলক্ষে আমরা দিবারাত্রি ডিউটি করে যাচ্ছি। আশা করছি যানজটের ভোগান্তি থেকে ঘরমুখো মানুষকে মুক্ত করতে পারবো।

কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াহিদ মোরশেদ বলেন, যানজট নিরসনে আমরা তৎপর রয়েছি। টহল টিমও বাড়ানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ অংশে মানুষকে যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না বলে আশাবাদী।

এদিকে শিল্প অধ্যুষিত গাজীপুরের দুই মহাসড়কে বেড়েছে যাত্রীর চাপ তবে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোথাও যানজটের সৃষ্টি হয়নি। স্বস্তিতেই বাড়ি ফিরছেন ঘরমুখী মানুষ। যাত্রীরা নির্বিঘেœ গন্তব্যে যাচ্ছেন। সড়কে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যানবাহনগুলো যাত্রী নিয়ে দ্রুত গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। চাপ বাড়লেও মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। মহাসড়কের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীরাও কাজ করছে।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগে যেমন শত শত মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করে থাকত, এখন আর সে অবস্থা নেই। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাসগুলো যাত্রী তুলছে এবং গন্তব্যে চলে যাচ্ছে।

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় সকাল থেকে যানবাহন এবং ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক চাপ বেড়েছে। সেখানে সার্ভিস লেনে যাত্রী ওঠানামা করানোর জন্য কিছুটা ভিড় থাকলেও মূল সড়কে কোনো যানজট নেই। অনেকটা স্বস্তি নিয়ে মানুষ চলাচল করছে। এছাড়া সকাল থেকে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে মানুষ বাড়ি ফিরছে। এই দুই মহাসড়কের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা চান্দনা চৌরাস্তা ও চন্দ্রা স্টেশনে যাত্রী ও পরিবহনগুলো ভিড় করছে।

গাজীপুরের কারখানাগুলো বৃহস্পতিবার ছুটি দেয়া হয়েছে। যানজট এড়ানোর জন্য ঘরমুখো যাত্রীরা আগেই বাড়ি ফিরছেন। যাত্রীদের অনেকেই বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যাত্রী টানতে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে কম ভাড়া নেয়া হতো। এখন নির্ধারিত ভাড়া নেয়ায় অনেকে এটিকে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ করছেন।

পুলিশ জানায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তায় যাত্রীরা ভিড় করছেন। অনেকেই কাঙ্ক্ষিত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে আছেন। স্টপেজগুলোতে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। তবে কোথাও কোনো যানজট পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

জেলায় ২ হাজার ১৭৬টি ছোট বড় কলকারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ১ হাজার ১৫৪টি পোশাক কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করেন প্রায় ২২ লাখ কর্মী। এরইমধ্যে অনেক কলকারখানা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। যানজট থেকে রেহাই পেতে ঘরমুখো মানুষেরা আগেভাগেই ঈদযাত্রা শুরু করেছেন।

কারখানার শ্রমিক জিহাদুল ইসলাম জানান, কারখানা ছুটি হওয়ার পরপরই যানজটের কথা চিন্তা করে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরছেন ঈদ উদযাপন করতে। শ্রমিক সালমা বেগম জানান, নাটোর যাওয়ার জন্য সকাল ৭টা থেকে অপেক্ষা করছেন চন্দ্রা এলাকায়। অনেক গাড়ি থাকলেও ভাড়া চাইছে বেশি।

নাওজোর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রইছ উদ্দিন জানান, মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কখনো কখনো জটলার সৃষ্টি হলেও তা খুব একটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে না। যানজট নিরসনে পুলিশের ৩০০ এবং জেলা পুলিশের ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।

অপরদিকে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও সকাল থেকে যানবাহন চলাচল একেবারে স্বাভাবিক। অন্য সময় কিছু কিছু পয়েন্টে যানজট থাকলেও এবার কোথাও যানজটের খবর পাওয়া যায়নি।

গাজীপুরের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) অশোক কুমার পাল সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর অংশে কোথাও যানজট নেই। যানবাহনগুলো স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। যানজট নিরসনে মহানগর পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। মহাসড়কে কোনো অটোরিকশা যাতে না উঠতে পারে সেজন্য পুলিশ কাজ করছে। এছাড়া সড়কে পুলিশের পাশাপাশি বেশ কিছু সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে।