কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো

সিলেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নগরীর রায়নগর এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও কাজের মেয়ে যে বাসায় থাকতেন সেই নিকুঞ্জ ভিলায় এখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। তবে এই বাসায় কখনো পোশাকধারী পুলিশ, কখনো র‌্যাবের সোর্স আবার কখনো সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনাগোনা চোখে পড়ছে। সিলেটের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স এর সাবেক পরিচালক আব্দুস সাত্তার স্ত্রীসহ নিহত হওয়ায় এলাকার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ আসামী ধরার জন্য জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সন্দেহভাজন গ্রেফতারকৃত বাবুল মিয়াকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করে তিন খুনের রহস্য উদঘাটন করতে পারবে বলে আশা করছেন এসএমপি’র শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রবাসে থাকা নিহত দম্পতির দুই মেয়ে দুপুরে সিলেটে এসেছেন যুক্তরাজ্য থেকে এবং আজ শুক্রবার নিহতের ছেলে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

শেষ বয়সে পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিতে কাটাবেন এই স্বপ্নে মনের মতো করে সাজিয়েছিলেন ‘নিকুঞ্জ ভিলা’। বাহারি ফুল আর নানা জাতের গাছ-গাছালিতে ঘেরা সেই বাড়িটিই ছিল মো. আব্দুস সাত্তারের আপন ঠিকানা, শান্তির আশ্রয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের হাতে সাজানো সেই নিকুঞ্জ ভিলাতেই থেমে গেল স্ব-স্ত্রীক তাঁর জীবনের পথচলা। অপ্রত্যাশিত এক হত্যাকা-ে স্ত্রীসহ নির্মমভাবে খুন হন আব্দুস সাত্তার। এসময় তাঁর বাসার গৃহকর্মীকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ফলে যে নিকুঞ্জে ছিল স্বপ্ন আর শান্তির আবাস, সেই নিকুঞ্জেই এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

এই ট্রিপল হত্যাকা-ের ঘটনায় ওই দিন বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে (৪ ঘন্টার ভেতরে) অভিযান দিয়ে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা এবং মৃত নূর মিয়ার (কবিরাজ) ছেলে বাবুল মিয়া (৪০) কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে হত্যাকা-ের ঘটনার কথা স্বীকার করেন তিনি।

বাবুল মিয়া গ্রেফতার ও হত্যাকা-ের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে বলেন, গত বুধবার সকাল ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় ভয়াবহ ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত একটি বিশেষ টিম গঠন করে। প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়। পরে বিকেল ৩টার দিকে রায়নগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

তিনি জানান, গত বুধবার হত্যাকারী বাবুল মিয়া একটি ছুরি নিয়ে ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল মিয়া ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। এ সময় আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। পুলিশের গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে গ্রেফতার করে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

রহস্য উৎঘাটনে পুলিশ

হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত বাবুল মিয়ার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। এতে শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত উদ্ধারের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব তথ্য জানান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, হত্যাকা-ের পর বাবুল মিয়া ছোরাটি রায়নগর এলাকার একটি খালি প্লটে ফেলে দেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও ছোরাটি পাওয়া যায়নি। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে পুনরায় সেখানে তল্লাশি শুরু করা হয়। একপর্যায়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। ছোরায় থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে ছোরায় থাকা রক্ত কার, সেটিও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকা-ের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশে শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। এছাড়া একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া যে ধরনের ছোরার কথা বলেছেন, উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে তার যথেষ্ট মিল রয়েছে। বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজও করেন। কসাইয়ের কাজে ব্যবহৃত ছুরি সাধারণত শক্ত ও মজবুত হয়ে থাকে। বাবুলের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, ছোরাটি ছয় থেকে সাত ইঞ্চি লম্বা এবং কাঠের হাতলযুক্ত হওয়ার কথা। উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে সেই বর্ণনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে ছোরাটি হত্যাকা-ে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। হত্যাকা-ের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানান, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি-না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গ্রেফতার বাবুল মিয়ার বরাত দিয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, প্রথমে গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা করা হয়। তাকে রক্ষা করতে গৃহকর্ত্রী এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পরে গৃহকর্তা এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বাবুল মিয়া। গৃহকর্মীর আচরণে বাবুল মিয়া ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

দেশে ফিরছেন স্বজনরা

নিহত আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া আক্তারের সন্তানরা সবাই প্রবাসে অবস্থান করছেন। নিহত এই দম্পতির চার সন্তান রয়েছেন। তার মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন আবার আরও দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই মেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশে পৌছেছেন। স্বজনদের বহনকারী ফ্লাইটটি সকাল সাড়ে ৯টায় অবতরণের কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে দুপুর দেড়টায় সিলেটে পৌঁছেছে। অপরদিকে, নিহতের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরিফ ইফতেখার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আজ শুক্রবার দেশে আসবেন।

বর্তমানে নিহত দম্পতির লাশ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে প্রবাসী সন্তানরা দেশে পৌঁছালে জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করা হবে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির।

কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ‘সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে স্থানীয়দের সহায়তায় সন্দেহভাজন বাবুলকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর সে এলাকা ত্যাগ না করে রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনিতে অবস্থান করছিল। সাদাপোশাকে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। নিহতের মেয়েদের সাথে কথা হয়েছে।