অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। র্যাবের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে এবং আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে জানান তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় র্যাব-৬ খুলনার সদর দপ্তরে সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন র্যাব মহাপরিচালক।
অভিযানে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
সুন্দরবনে ৫৯ জলদস্যুর আত্মসমর্পণ
এর আগে মঙ্গলবার সুন্দরবনের পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর ৫৯ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। একই সময়ে অভিযান চালিয়ে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করে র্যাব-৬।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান এবং একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল।
আত্মসমর্পণকারী ৫৯ জনের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতাব বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন।
৩১৮ জলদস্যুর আত্মসমর্পণ, আবার অপরাধে ফিরেছে ৩০ জন
র্যাব মহাপরিচালক জানান, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের মোট ৩১৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।
আত্মসমর্পণকারীদের একটি অংশ পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়ার পরও কেন অপরাধে ফিরছে, সেটিকে নতুন করে ভাবনার বিষয় হিসেবে দেখছে র্যাব। সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অনীহা এবং হয়রানির আশঙ্কাসহ বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করেন তিনি।
তবে ৩১৮ জনের মধ্যে ৩০ জনের অপরাধে ফিরে যাওয়ার হারকে খুব বেশি মনে করছেন না র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, সবাইকে শতভাগ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আত্মসমর্পণকারীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুনর্বাসন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের তুলনায় আরও কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলে জানান র্যাব মহাপরিচালক। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক মামলা ও হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক বা মামলা দেওয়া উচিত নয় উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সুন্দরবনে এখনো সক্রিয় ৪-৫টি দস্যু বাহিনী
র্যাবের মহাপরিচালক জানান, সুন্দরবনে এখনো চার থেকে পাঁচটি জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদেরও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আত্মসমর্পণকারীদের জন্য নেওয়া পুনর্বাসন প্যাকেজ দেখে অন্য দস্যুরাও উৎসাহিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। স্থানীয় সুন্দরবনবাসী চাইলে র্যাবের ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারেন বলেও জানান তিনি।
‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক। উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা এবং দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গত ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান চালিয়ে আসছে র্যাব ফোর্সেস।
এদিকে বন্য প্রাণীর প্রজনন, বিচরণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন আবার পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।