মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে : সামান্য শব্দ শুনলেই চমকে ওঠেন বৃদ্ধা শেফালী বেগম। দৃষ্টি ঝাপসা হলেও তিনি প্রতিনিয়ত খুঁজে ফেরেন প্রিয় সন্তানের মুখ- যেন এখনই ফিরে আসবে। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর কাছে ফিরে আসে শূন্যতা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার নিঃশ্বাস। এই অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু তাঁর ছেলে বাদল ফরাজী, যাকে ঘিরে প্রায় দুই দশকের দুঃখ-বেদনা জমাট বেঁধে আছে।
তিনি বর্তমানে তাঁর মেয়ে আকলিমা খাতুনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। প্রায় ৭০ বছর বয়সী এই নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, জীবনের শেষ ইচ্ছা হিসেবে তিনি শুধু একবার ছেলের মুখ দেখতে চান। কথা বলতে গিয়েও বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন তিনি।
শেফালী বেগম জানান, ছেলের চিন্তায় তাঁর স্বামীও মৃত্যুবরণ করেছেন। বর্তমানে তিনি নিজেও অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায় আছেন। তবুও প্রতিদিন নামাজ শেষে ছেলের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করে চলেছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবার রোজা রাখতে না পারলেও পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ছেলের মুক্তির আশায় তিনি একাধিকবার নফল রোজা পালন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, তাঁর ছেলে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। ভারতে বন্দি অবস্থায় তিনি স্নাতক ডিগ্রিসহ আটটি ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন এবং বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এমনকি কারাগারে অন্য বন্দিদেরও শিক্ষা দিতেন। তাঁর ভালো আচরণের জন্য বাংলাদেশের কারাগার থেকেও প্রশংসাপত্র পেয়েছেন।
বাদলের মামা হাফেজ মো. দ্বীন ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন বাদল। তবে তাজমহল দেখার ইচ্ছাই তাঁর জীবনের বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৮ সালের ১৩ জুলাই, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় বাদল বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে ভারতের আগ্রায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেনাপোল সীমান্ত অতিক্রম করেন। কিন্তু সেখানে প্রবেশের পরপরই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে ‘বাদল সিং’ নামে এক হত্যাকাণ্ডের আসামি হিসেবে ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়। অথচ ওই হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ভারতে প্রবেশই করেননি।
পরবর্তীতে দিল্লির একটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আপিলের পরও রায় বহাল থাকে। বিষয়টি মানবাধিকারকর্মীদের মাধ্যমে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নজরে এলে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ৭ জুলাই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে দেশে ফেরার পরও মুক্তি মেলেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতীয় আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ১৪ বছর হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই অনুযায়ী ২০২২ সালের জুলাই মাসেই তার সাজা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না পাওয়ায় এখনো তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং অতিরিক্ত কয়েক বছর সাজা ভোগ করেছেন।