রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ষষ্ঠতম সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দীতে বলেছেন, ‘গুলী করা হয়েছে মরেনি, ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন’ এসব কথা বলে হাসপাতালে গিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন ডাক্তারদেরকে হুমকি দিয়েছেন। পরে ডাক্তারগণ কোন প্রকার কাগজপত্র ছাড়াই সাক্ষীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেন।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ষষ্ঠতম সাক্ষী তিনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তিনি রাজধানীর রামপুরার মেরাদিয়ায় একটি বাড়ির দারোয়ান হিসেবে কাজ করেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গুলীবিদ্ধ হন তিনি।
জবানবন্দীতে সাক্ষী বলেন, আমি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে রামপুরা থানার পাশে মেরাদিয়া কাঁচাবাজারে ছাত্র-আন্দোলন দেখতে যাই। বাজারে যেতেই বিজিবি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন মিলে ছাত্রদের ওপর গুলী করতে দেখি। এতে গুলীবিদ্ধ হয়ে কিছু লোক মারা যান। আহত হন আরও অনেকে। সবাই রক্তাক্ত ছিলেন। এসব দেখে ভয়ে বাসার দিকে রওনা হই। তখন পেছন থেকে আমার কোমরের নিচে একটি গুলী লেগে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। এ সময় প্যান্ট খুলে নিজের গুলীবিদ্ধের ক্ষতস্থানটি দেখান তিনি।
সাক্ষী আরও বলেন, গুলীবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আমাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান কিছু লোক। ওই দিন চিকিৎসা হলেও ২০ জুলাই রাতে আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কারণ ওই দিন হাসপাতালের চিকিৎসকদের হুমকি দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের লোকজন। তারা বলেছিলেনÑ‘এদের গুলী করা হয়েছে মরেনি, এদের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন’। এরপর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র আমাকে দেওয়া হয়নি। বাসায় ফিরে আসার পর আমার বাসায় আসেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বলা হয়, ‘তুমি গুলী খেয়েছো, এই এলাকায় থাকতে পারবে না’। তবে এলাকার নির্দলীয় একজন আমাকে ভরসা দেন। পরবর্তী সময়ে আমি নিজ খরচে ফরাজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।
নিজে গুলীবিদ্ধ হওয়ার জন্য বিজিবির রেদোয়ান, রাফাত, পুলিশের রাশেদ ও ওসি মশিউরকে দায়ী করেন সাক্ষী। বর্তমানে কোনো কাজ করার সক্ষমতা নেই বলেও জানানো হয়। একইসঙ্গে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জড়িতদের বিচার দাবি করেন এই সাক্ষী।
এ মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম।
পলাতকরা হলেন- ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।
জামিন মেলেনি সাবেক ওসি আশরাফ ও ডিবির শফিকের
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কলেজছাত্র হৃদয় হোসেনকে হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গাজীপুরের কোনাবাড়ি থানার সাবেক ওসি কেএম আশরাফ উদ্দিনসহ দুজনকে জামিন দেননি ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ বিষয়ে শুনানি হয়। অন্য সদস্য হলেনÑ বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জামিন চাওয়া অপরজন হলেনÑ গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
আশরাফের পক্ষে শুনানি করেন সিফাত মাহমুদ শুভ। অসুস্থ থাকায় মানবিক বিবেচনায় আশরাফ উদ্দিনের জামিন চান তিনি। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়ার এক বছরেও প্রসিকিউশন থেকে তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় আইনি ব্যাখ্যা তুলে শফিকুলের জামিন চান তার আইনজীবী। তবে তাদের এসব যুক্তি নিয়ে বিরোধিতা করে প্রসিকিউশন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আশরাফ ও শফিকুলের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণাদি মিলেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। একই সঙ্গে জামিন না দেওয়ার আর্জি জানান।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে জামিনের বিষয়ে কোনো আদেশ না দিয়ে আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এ প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম বলেন, গাজীপুরের কোনাবাড়িতে হৃদয় নামের এক শিক্ষার্থীকে খুব কাছ থেকে গুলী চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুলী চালান আকরাম। তিনি স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। সেই মামলায় গত ১২ মে ডিবির শফিকুল ইসলাম ও সাবেক ওসি আশরাফুল উদ্দিনের জামিন চেয়ে আবেদন করেছিল আসামিপক্ষ। গতকাল শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
তিনি বলেন, শফিকুল ইসলামের পক্ষে গ্রাউন্ড দেখানো হয়েছে যে, যদি গ্রেপ্তারের এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়া হয়, তাহলে জামিন দিতে পারেন আদালত। এ ছাড়া আশরাফের ক্ষেত্রেও একই গ্রাউন্ডসহ অসুস্থতা দেখিয়ে জামিন চেয়েছেন। একই সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্য সনদও দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা বলেছি আদালত চাইলে এ সময় আরও ছয় মাস বাড়াতে পারেন। পরে কোনো ধরনের আদেশ দেননি আদালত।
প্রসিকিউটর মঈনুল বলেন, এ মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই দুজনের জড়িত থাকার পর্যাপ্ত প্রমাণাদি পেয়েছি আমরা। এছাড়া লাশটি এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুলী করে হত্যার পর গভীর রাতে গাড়িতে তুলে আশরাফ ও শফিকুলের মদদে লাশটি করতোয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই দুজন ছাড়াও বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন আরও পাঁচজন। তারা হলেনÑ ঢাকা উত্তরের উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ হেল কাফি, এসআই শেখ আবজালুল হক, কনস্টেবল আকরাম হোসেন, কনস্টেবল ফাহিম ও কনস্টেবল মাহমুদুল হাসান সজিব।
প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলে অংশ নেন হৃদয়। ওই দিনই তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পুলিশ। গুলী করার পর হৃদয়ের রক্তাক্ত দেহটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তার মরদেহের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি।