চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে স্বামী বদিউজ্জামান নিহত হওয়ার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন স্ত্রী আদুরী খাতুন। তিনি সাক্ষ্য দেওয়ার সময় উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন বিকেলে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে গিয়ে ট্রলিতে স্বামীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার পর গোসলের সময় তার সারা শরীরে আঘাতের দাগ দেখতে পান।
নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন আদুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
৩০ বছর বয়সি আদুরীর বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায়। তিনি জুলাইয়ে শহীদ বদিউজ্জামানের স্ত্রী। তার স্বামী নারায়ণগঞ্জে নিট কনসাট গ্রুপে চাকরি করতেন। তিনিও নারায়ণগঞ্জে বনানী গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ সালে বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এসিআই পানিরকল এলাকায় থাকতেন তারা।
সাক্ষ্যে আদুরী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে নাশতা খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে চাষাঢ়ায় যান আমার স্বামী। এরপর তার সঙ্গে আমার আর ফোনে যোগাযোগ হয় নি। বিকেল ৫টার দিকে আমাকে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে যেতে বলেন আমার দেবর স্বাধীন। হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার স্বামীর লাশ। তাকে বারান্দায় ট্রলিতে রাখা হয়েছিল। তখন লাশটি দ্রুত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে ফেলতে বলেন শামীম ওসমানের লোকজন।
তিনি বলেন, তাদের হুমকিতে আমরা লাশটি বাসায় নিয়ে আসি। সেখানে গোসল ও জানাযা শেষে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পুনরায় গোসল-জানাযার পর দাফন করা হয়। তবে আমার স্বামীর লাশকে গোসল করানোর সময় সারা শরীরে আঘাতের দাগ দেখতে পেয়েছিলেন লোকজন। স্বামীকে দাফন করার তিন-চারদিন পর আমি নারায়ণগঞ্জে ফেরত আসি। পরবর্তী সময়ে জানতে পারি যে, শামীম ওসমান ও তার লোকজন মিলে আমার স্বামীকে আঘাত করে হত্যা করেছেন। তারা ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া গোল চত্বরের সামনে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। এর মধ্যে শামীম ওসমান, আজমেরী ওসমান, অয়ন ওসমান, টিপু ও আওয়ামী লীগের আরও অনেক লোক ছিলেন।
বদিউজ্জামানের স্ত্রী জানান, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ব্যক্তিদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে আমার স্বামীর নাম ৪৯১ নম্বরে রয়েছে। এ সময় ট্রাইব্যুনালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার চান আদুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান, মামুনুর রশিদ, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
‘গডফাদার’ শামীম ওসমানের নেতৃত্বে হামলায় হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ : জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’ শামীম ওসমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলায় বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছেন কাউসার আহমেদ নামে এক সাক্ষী। ওই হামলায় নিজের বাম পায়ে গুলী লাগার পর রাস্তায় পড়ে যান বলেও তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন তিনি।
কাউসারের বয়স ৫১ বছর। তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলায়। বাড়ি ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহানগর শ্রমিকদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নাম 'গ' শ্রেণির আহত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়েছে।
জবানবন্দিতে কাউসার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় বাসা থেকে বের হয়ে আধাঘণ্টার মধ্যে চাষাঢ়া মোড়ে পৌঁছাই। সেখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেই। আন্দোলনরত অবস্থায় দুপুর পৌনে ২টার দিকে চাষাঢ়া মোড়ে শামীম ওসমানের বাড়ির সামনে আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালান ২০-২৫ জন। এর মধ্যে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, টিটু, শাহ নিজাম, ফাইজুল, নিয়াজুল, টিপু, দিপু, সাইদ ছিলেন। তাদের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ছিল। তাদের ছোড়া একটি গুলী আমার বাম পায়ে লাগে। এতে আমি রাস্তায় পড়ে যাই।
তিনি বলেন, কে বা কারা আমাকে খানপুর হাসপাতালে নিয়েছে বলতে পারবো না। তবে চিকিৎসা না করাতে চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন শামীম ওসমান। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে আমাকে ঢাকা মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা দেখে বলেন যে, এই গুলী বের করা সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে ডাক্তাররা আমাকে ৮ আগস্ট অপারেশন করে গুলী বের করেন।
শ্রমিকদল নেতা জানান, ৫ আগস্ট আমি ছাড়াও আরও অনেকে গুলীতে আহত হয়েছিলেন। সুজন নামে একটি ছেলে প্রাণ হারিয়েছেন। তার বাড়ি বন্দর এলাকায়। শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের গডফাদার। তার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা নারায়ণগঞ্জে বহু মানুষকে আহত ও নিহত করেছেন। এ সময় নিজেকে ও অন্যান্য আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং আহত করার জন্য জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান সাক্ষী।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন, আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান।