পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি আবারও পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতের কেন্দ্রে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, প্রণালিটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে ইরান ঘোষণা করেছে, হরমুজের কাছে নতুন একটি ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা নিষিদ্ধ এলাকা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার ফলে বিশ্বের জ্বালানি পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ট্রাম্প আলোচনার পথ ছেড়ে বার বার শক্তি প্রয়োগের দিকে যান। বার বার ওয়াদা ভঙ্গ করে ইরানে হামলা চালায় ট্রাম্প বাহিনী। আর এ কারণে তার আঁচ লেগেছে হরমুজে।

অতি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশের এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীও ইরানের বেশ কিছু তেল ট্যাংকার ও স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজে হামলা করেছে তারা। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে।

ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে সর্বশেষ এই পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করেছে। আঞ্চলিক মিত্ররাও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ প্রায় একমাস ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। এখন এই উত্তেজনার মধ্যে তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করেছিল, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন সাবমেরিন জব্দ করেছে। আইআরজিসি বলেছে, তারা যে ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ২টি মার্কিন জাহাজ ও ৮টি তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল। হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চালকবিহীন সাবমেরিন ড্রোন জব্দ করার দাবি করেছে ইরান। এর মধ্য দিয়ে সামরিক অভিযানে পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোন কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার একটি বিরল চিত্র সামনে এসেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, জব্দ করা যানটি ডাইভ-এলডি মডেলের একটি বড় স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান। তাদের দাবি, যানটিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। তবে ইরানের এই দাবি নাকচ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন। সংস্থাটির এক মুখপাত্র বলেছেন, একটি পানির নিচের ড্রোন এক দিনেরও বেশি সময় আগে বিকল হয়ে পড়েছিল।

আরো জানা যায়, গত এক সপ্তাহে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৭৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল আরও বেশি। বিশেষ করে পণ্যবোঝাই জাহাজের সংখ্যা ৪৫ থেকে কমে ৩৩টিতে নেমেছে। কেপলারের তথ্য বলছে, ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রণালিটি অতিক্রম করা ২৮টি জাহাজের মধ্যে ২১টি ইরানের নির্ধারিত বিকল্প রুট ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ জাহাজগুলো প্রচলিত নৌপথ এড়িয়ে ইরানের নির্দেশিত পথে চলেছে। শুধু ওই সময়েই নয়, ৬ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা আটটি জাহাজের সাতটিই ইরানের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে কেপলার।

এতে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজের নৌ চলাচলে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে গেলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, তেলের দাম, এলএনজি সরবরাহ, খাদ্য ও সারের বাজার এবং এশিয়ার অর্থনীতি। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতিটি গভীরভাবে উদ্বেগের।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ? : হরমুজ প্রণালি ভৌগোলিকভাবে সরু হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব বিশাল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। চীন, ভারত ও জাপানসহ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলো তাই হরমুজের নিরাপদ নৌ চলাচলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ক্ষেত্রেও হরমুজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে গেছে। হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা মানে শুধু তেলের বাজারে সংকট নয়; একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়া।

নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান : বর্তমান সংঘাতের মূল জায়গাটি এখানেই। ওয়াশিংটন হরমুজকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে চাইছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, কোনো দেশ একতরফাভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ট্রাম্প সম্প্রতি এমনকি হরমুজের নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ করার কথাও বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রণালিটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে জাহাজ চলাচলের বাস্তব তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় সে কথা আগেই বলেছি। তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, প্রণালির কাছে নতুন ‘এক্সক্লুশন জোন’ তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হরমুজের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা নয়। বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক, বিমা কোম্পানি, নাবিক, তেল ব্যবসায়ী ও বন্দর কর্তৃপক্ষ—সবার কাছে প্রণালিটি কতটা নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের অংশ। কোনো পথ কাগজে খোলা থাকলেও যদি জাহাজ মালিকেরা সেখানে যেতে ভয় পান, তাহলে কার্যত সেই পথের বাণিজ্যিক সক্ষমতা অনেকটাই অচল হয়ে যায়। যার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার গুরুত্র প্রভাব পড়তে বাধ্য।

তেলের বাজারে এর প্রভাব : হরমুজ সংকটের প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে কয়েক ডলার বেড়ে যায়। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্রেন্টের দাম প্রায় ৯৮ ডলারে উঠেছিল বলে বাজার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপদের বড় জায়গা হলো দীর্ঘস্থায়ী সংকট। সংশ্লিষ্ট সংস্থা আইইএ বলছে, হরমুজের বাইরে তেল সরিয়ে নেওয়ার বিকল্প সক্ষমতা সীমিত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিলিয়ে আনুমানিক ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল দৈনিক বিকল্প পরিবহন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী বিপুল পরিমাণ তেলের তুলনায় এটি যথেষ্ট নয়। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজারে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও সময়—সবই বাড়বে।

এলএনজি ও খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি : হরমুজ সংকটকে শুধু ‘তেলের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি রপ্তানিকারক। হরমুজ দিয়ে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপুল পরিমাণ এলএনজি এশিয়া ও ইউরোপে যায়। এর বিকল্প সমুদ্রপথ কার্যত নেই। এ কারণে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা হলে এশিয়ার গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং শিল্প খাতের খরচও বাড়বে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এ ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কি এটি ঝুঁকিমুক্ত? : হরমুজ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সামুদ্রিক পথ ‘নিরাপদ’ রাখা এবং দীর্ঘদিন ধরে সেটির স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট আকারের দ্রুতগামী নৌযান এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার ঝুঁকি রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে হামলা ও পাল্টা হামলা বেড়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে মাইন পাতা হলে তা পরিষ্কার করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। মার্কিন বাহিনী হরমুজ এলাকায় মাইন অপসারণের অভিযান চালিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। বাস্তবে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে নিরাপদ রাখা ততটা সহজ নয়।

হরমুজ সংকটের সামরিক সমাধান নেই—অন্তত দীর্ঘমেয়াদে নেই। যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক শক্তি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে চায় এবং ইরান যদি প্রতিটি পদক্ষেপের জবাব সামরিকভাবে দেয়, তাহলে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বাড়তে পারে। হরমুজে উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু পেট্রোল-ডিজেলের দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, সার, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবখানেই এর অভিঘাত পড়তে পারে।

হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান লড়াই আসলে একটি বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ কি সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হবে, নাকি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপদ রাখা হবে? হরমুজের গুরুত্ব এত বেশি যে এখানে সামান্য ভুল হিসাবও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তেলের দাম, এলএনজি সরবরাহ, খাদ্য উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমাধানের পথ তাই শক্তি প্রদর্শনে নয়—আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং পারস্পরিক সমঝোতায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও আলোচনার টেবিলে বসবে কি না সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়।