গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালক আতাউর রহমান আতা (৬০)-কে নির্মমভাবে হত্যার পর তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে বৃদ্ধা মা জহুরা খাতুনেরও মৃত্যু হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুর জেলা। ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই আসামিকে গ্রেফতার, ছিনতাইকৃত অটোরিকশা ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় চোরাই অটোরিকশা ক্রয় ও হেফাজতে রাখার অভিযোগে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ২০ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে কাপাসিয়া উপজেলার মিজজানগর এলাকার কৃষক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক আতাউর রহমান আতা মিয়া জীবিকার উদ্দেশ্যে নিজের অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। অটোরিকশাটির আনুমানিক মূল্য ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ওইদিন রাত ৮টার আগে কোনো এক সময় সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণগাঁও মিজজানগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে একটি নির্জন কলাবাগানের সামনে ছিনতাইকারীরা তাকে আটকে নির্মমভাবে হত্যা করে অটোরিকশা ও একটি বাটন মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।

আতাউর রহমানের লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যদের কাছে খবর পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ সহ্য করতে না পেরে তার ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা জহুরা খাতুনও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। একই দিনে মা ও ছেলের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়েরের পর ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোঃ মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পিবিআই গাজীপুর জেলা তদন্তের জন্য গ্রহণ করে।

পিবিআই জানায়, অ্যাডভান্সড আইসিটি, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গত ২১ আগস্ট রাতে কাপাসিয়ার চালার বাজার ও নরোত্তমপুর এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার ভাগটিয়া চালার বাজার গ্রামের রাজ্জাক খানের ছেলে রাজীব খান (২৯) এবং গাজীপুরের কাপাসিয়া থানার মিজজানগর এলাকার নাছির উদ্দীনের ছেলে নকিবুল হাসান ওরফে রাকিব (২৪)।

তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নরসিংদীর মনোহরদী থানাধীন হাতিরদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘আল-মদিনা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ছিনতাই করা অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। চোরাই অটোরিকশাটি ক্রয় ও হেফাজতে রাখার অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোঃ কিবরিয়া (৪২)-কে গ্রেফতার করা হয়।

এ ছাড়া আসামিদের কাছ থেকে অটোরিকশা বিক্রির নগদ ২২ হাজার টাকা এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লোহার রড, হাতুড়ি ও রশি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই সূত্রে আরও জানা যায়, গ্রেফতারকৃত রাজীব খান ও নকিবুল হাসান আদালতে স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা জানায়, ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে তারা অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে। নকিবুলের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হওয়ায় আতাউর রহমানকে তারা সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২০ আগস্ট বিকেলে তারা আতাউর রহমানকে ফোন করে ডেকে নিয়ে নির্জন কলাবাগানের পাশে অটোরিকশা থামায়। সেখানে রশি দিয়ে তার গলা চেপে ধরে এবং লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করে। পরে অটোরিকশা ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়।

হত্যাকাণ্ডের পর অটোরিকশাটি নরসিংদীর হাতিরদিয়া এলাকায় নিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। পরে চোরাই মালামাল ক্রেতা কিবরিয়ার কাছে অটোরিকশাটি ৪২ হাজার টাকায় বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার বলেন, 'একজন নিরীহ অটোরিকশা চালককে হত্যা এবং তার পরপরই শোকাহত মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। অপরাধীরা ভেবেছিল নির্জন স্থানে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু পিবিআইয়ের পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর জোড়া মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা মূল আসামিদের গ্রেফতার ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ে আদালতে যথাযথ চার্জশিট দাখিলের জন্য তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।'

এ ঘটনায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন, আসামি গ্রেফতার এবং ছিনতাইকৃত অটোরিকশা উদ্ধারে পিবিআই গাজীপুর জেলার তৎপরতা প্রশংসিত হয়েছে।

মামলাটির তদন্ত তদারকি করছেন পিবিআই গাজীপুর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার। তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী।