আমাদের সংখ্যাগত নয় মানসম্পন্ন শিক্ষা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও জাতীয় উন্নয়ন শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।
এতে আলোচক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এমপি, দেওয়ান সালাহ উদ্দিন বাবু এমপি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, এবি পাটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন এমপি, ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ এমপি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক সরোয়ার তুষার, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারগণ।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, বাজেট আসে বাজেট যায়। ১৯৮৪ সাল থেকে অনেক বাজেটে থেকেছি এবং অনেক বাজেটে না থেকে দেখেছি। যেসব বাজেটর মধ্যে চরিত্রগত কোনো পার্থক্য দেখি নাই। একই পদ্ধতিতে চলে আসছে। গদবাধা বাজেট, গরিব মারার বাজেট নামে স্লোগান আমরা দিয়েছি। কিন্তু বাজেটের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, বাজেটের পরিবর্তন হতে পারে তখনই যদি আমারা যে টাকাগুলো উপার্জন করি সেগুলো হালাল হয়। কোনো হারাম টাকায় বাজেট করলে সেখানে কোনো বরকত হতে পারে না। সেজন্য আমাদের উপার্জন হতে হবে হালাল। ব্যক্তি উপার্জন যেমন হতে হবে হালাল, তেমনি জাতীয় উপার্জনও হতে হবে হালাল। হারাম দিয়ে জাতিকে কোনো কল্যাণকর কিছু দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বাজেট আসলে জিনিসপত্রের দাম আবার বাড়ল জনগণের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়। এমনি তেলের কারণে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাজেট আসলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জনগণ পেরেশান হয়ে যাচ্ছে। এজন্য কৃষকের বাজেট, শ্রমিকের বাজেট, শিক্ষকের বাজেটকে বিশ্লেষণ করে আমাদের দেখতে হবে জনগণের কল্যাণের জন্য কতটুকু কি করা যায়।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যেক মুসলমানকে জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। এই জ্ঞান কি ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি আর বাজেট? কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল বুঝিয়েছেন। প্রত্যেকটি মানুষের যদি বেসিক নলেজ না থাকে, সুন্নাহর মৌলিক জ্ঞান না থাকে, অন্তত বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের জন্য বক্তব্যটি উপযোগী হইতে পারে না। উপযোগী হওয়ার জন্য আমাদের সকলকে কুরআন সুন্নাহর মৌলিক চেতনাগুলো আমাদের সামনে রাখতে হবে। আমাদের সংখ্যাগত নয় মানসম্পন্ন শিক্ষা দরকার। তাহলে আমাদের শিক্ষার মান বাড়বে, ইনশাআল্লাহ। তিনি আরও বলেন, সুদভিত্তিক অর্থনীতি একজন মানুষের জীবনে কিংবা জাতীয় জীবনে কল্যাণ আনতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সুদকে ধ্বংস করেছেন, কারণ এটি মানুষকে ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালা দান ও যাকাতের মাধ্যমে মানুষের প্রতি এহসান করাকে বর্ধিত করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে অনেক কল্যাণ দান করেছেন।
ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ এমপি বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে বিনা খরচে শিক্ষা পাওয়া কথা বলা হয় সেখানে কিছু অদৃশ্য খরচ রয়েছে। আমাদের বাচ্চাদের স্কুল উপকরণগুলো সহজলভ্য না। শুধু বই ও স্কুলের বেতন ফ্রি করে দিলেই শিক্ষা ফ্রি হয় না। দ্বিতীয়ত; কর্মমুখী শিক্ষার যে কথা সেখানে দুটি ধারা খুবই অনুপযোগী। শিক্ষার্থীরা ভোকেশনাল ও মূলধারা জেনে বড় হয়। আমাদের স্কুলগুলো সমন্বিত না কেন? এসএসসি পাস করার সময় আমাদের প্রত্যেক বাচ্চা একটি করে বৃত্তিমূলক শিক্ষা পাওয়া সম্ভব কিনা। সম্ভব হলে এটাকে সমন্বিত করে দিচ্ছি না কেন? একটি স্কুল ও একটি ভোকেশনাল স্কুল একসাথে কাজ করবে। প্রত্যেক বাচ্চা একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষাসহ মূলধারায় শিক্ষিত হবে। এটা ছাড়া ভোকেশনালকে মূলধারায় আনতে পারছি না, আবার মূলধারার শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স পাসের পর সেখানে গিয়ে আবেদন করছে। এই দুর্বলতাগুলো দূর করা দরকার।
অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব বলেন, আমাদের বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ২% শিক্ষাখাতে ব্যয় করা হয়। অথচ শ্রীলঙ্গা, ভুটান ও অন্যান্য দেশে প্রায় ৫% থেকে ৬% ব্যয় করা হয়। তাই আমরা কতা পিছিয়ে আছি, সেটি উপলব্ধি করতে হবে এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি উদাহরণ হিসেবে মাহাতির মুহাম্মদের কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি ক্ষমতায় এসে শিক্ষাখাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের যেসব ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার ও প্রফেসর বিদেশে অবস্থান করছেন, তাদের উপযুক্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারা দেশেই ফিরে আসবেন। বর্তমানে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে ১০% থেকে ১২% বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ২০% করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষাখাতে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। শিক্ষাব্যবস্থায় দলীয়করণ করা হলে পুরো ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলেও সেখানে মেধার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। বাজেট প্রণয়নের আগে একটি সমন্বিত শিক্ষানীতি নিয়ে ভাবতে হবে, যেখানে জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় থাকবে। তাহলেই নতুন প্রজন্ম নৈতিক ও আদর্শবান হয়ে গড়ে উঠবে। প্রফেসর আব্দুর রব আরও বলেন, শিক্ষাখাতের বাজেট এমনভাবে বাড়াতে হবে যেন গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানরাও মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, বর্তমানে দেশে যোগ্য উপাচার্যদের সরিয়ে দলীয়ভাবে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণার প্রভাব বহন করছে। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত শিক্ষা কাঠামো স্বাধীনতার পরও মূলত অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি আজ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে এই শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। গবেষণার অভাবও প্রকট। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন অত্যন্ত কম; বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভারতে প্রায় দ্বিগুণ। তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, সকল শিক্ষাব্যবস্থার মূল হলো নৈতিক শিক্ষা ও আল্লাহভিত্তিক শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষের জীবনের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতে মাত্র ১.৬% থেকে ১.৮% বরাদ্দ দিয়ে দায়সারা অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাখাতের বাজেটকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব হবে এবং একটি যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত জাতি গড়ে উঠবে। মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা সহজভাবে মনেকরি, শিক্ষা হলো একটি মানুষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এটার মধ্যে নৈতিক শিক্ষা থাকতে হবে। সেটি অজকের স্কুল, মাদরাসা, ক্যাডেট কলেজই বলেন না কেন। আমাদের সেনাবাহিনীতে অফিসার হচ্ছে ৯০% ক্যাডেট কলেজ থেকে। এরা কাটা চামুচ দিয়ে ভাত খায়। এরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাটা চামুচ পাবে কোথায়? আমরা এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করি না, কথাও বলিনা।