মোংলা সংবাদদাতা: সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে কীটনাশক প্রয়োগ করে অবৈধভাবে মাছ শিকারের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাছ ধরার আড়ালে পরিচালিত এই কর্মকা-ে বনাঞ্চলের জলজ পরিবেশ ও সামগ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বনরক্ষীদের অভিযানে জব্দ হওয়া মাছের একটি বড় অংশেই বিষের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক অসাধু জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী এই কাজে জড়িত। তাদের সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে খালের পানিতে বিষ প্রয়োগ করে নির্বিচারে মাছ ধরা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বন বিভাগের ভেতরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে বলে তারা জানান। এতে সাধারণ জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ আহরণ বর্তমানে সুন্দরবনের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় শুধু মাছ নয়, বরং ডলফিন, কুমির, কচ্ছপসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী যেমন হরিণ ও বাঘ বিষাক্ত পানি পান করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এই দূষিত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পুরো খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সমন্বয়কারীরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে বিষ প্রয়োগের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।

অন্যদিকে বন বিভাগ জানায়, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল কারিম চৌধুরী বলেন, একটি খালে বিষ প্রয়োগ করা হলে সেখানে থাকা প্রায় সব মাছই মারা যায় এবং পুনরায় সেই খালে মাছের স্বাভাবিক উপস্থিতি ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে। পাশাপাশি মাছের খাদ্য হিসেবে কাজ করা ক্ষুদ্র প্রাণীরাও ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি আরও জানান, গত তিন মাসে পরিচালিত অভিযানে ৬৩৫ কেজি বিষাক্ত মাছ জব্দ করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অপরাধ দমনে ড্রোন ব্যবহার করে বিভিন্ন খাল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রায় ৪০০ নদী ও খাল এবং ৩০০ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল সুন্দরবনের এই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবিলম্বে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।