যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (CDC) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার হারও ছিল বেশ ভালো। কিন্তু গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বাধা তৈরি হওয়ায় এখন তার বড় প্রভাব পড়ছে।

গত মার্চ থেকে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। এছাড়া ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত ভিড় ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। একই সাথে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবও (৪২,৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি) তীব্র হওয়ায় হাসপাতালগুলো দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়েছে। গত এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা (মোট আক্রান্তের ৩৬%), রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম এই প্রাদুর্ভাবের মূল হটস্পট. আক্রান্তদের ৮২%-ই হলো ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।

হামের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)–এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।

হঠাৎ হাম এত বাড়ল কেন?

হাম এমন একটি রোগ, যা খুব সহজে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে নিয়মিত টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার হার ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল। এই হার ধরে রাখতে পারলে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়। ওই সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রমেও। টিকা দেওয়ার কিছু কর্মসূচি পিছিয়ে যায়, একটি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও বাতিল হয়।

এর পাশাপাশি টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন। ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এরপর একজন আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সহজেই অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

ছোট শিশুরাই কেন বেশি ঝুঁকিতে?

হামের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর একটি কারণ হলো, নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণ নিয়মে হামের টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায় না। ফলে তাদের শরীরে টিকার মাধ্যমে তৈরি সুরক্ষা থাকে না।

অন্যদিকে, যেসব বড় শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক সময়মতো টিকা নেয়নি, তারাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ টিকাদানে দীর্ঘ সময়ের ঘাটতি তৈরি হলে শুধু একটি বয়সের মানুষ নয়, পুরো সমাজের মধ্যেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

মহামারি বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদানের ঘাটতিই বাংলাদেশের হামের নির্মূল লক্ষ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এখন দ্রুত যেসব শিশুর টিকা নেওয়া হয়নি, তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমও আরও শক্তিশালী করতে হবে।

হাসপাতালে জায়গা নেই

হামের রোগী বাড়ার সময়েই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও চলছে। ফলে হাসপাতালগুলোকে একই সঙ্গে দুই ধরনের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতিও চাপের কথা বলছে। হাসপাতালটির হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা জানান, ১ হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য তৈরি হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

টিকা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা

এই সংকটের পেছনে শুধু টিকা না নেওয়ার বিষয় নয়, টিকা না পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগমের ১৩ মাস বয়সী ছেলে প্রায় দুই মাস আগে হামে আক্রান্ত হয়। প্রথমে চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও তিনি ছেলের জন্য শয্যা পাননি। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হলেও চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পরও ছেলের বারবার জ্বর হচ্ছে।

নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকায় নির্ধারিত সময়ে ছেলেকে টিকা দিতে পারেননি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গেলে তাকে জানানো হয়, তখন টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। তার বড় চার সন্তান অবশ্য নিয়মিত টিকা পেয়েছে।

আরেক পরিবারে আট মাস বয়সী একটি শিশুর হাসপাতাল থেকে ছাড়ার কয়েক দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর শিশুটিকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয় পরিবারটিকে।

শিশুটির বাবা মোহাম্মদ রিপনের ভাষায়, তারা শুধু এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছেন, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছিলেন না।

জরুরি টিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ঝুঁকি কি কেটেছে?

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি জরুরি কর্মসূচি দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ঠিক রাখতে হবে। যেসব শিশু আগের সময়ে টিকা পায়নি, তাদেরও খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে।

হাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় কী?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে—টিকাদান কর্মসূচিতে সাময়িক ঘাটতিও পরে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একদিকে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিস্তার, অন্যদিকে ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ—দুই সংকটই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্তদের চিকিৎসা করলেই হবে না। নতুন করে যাতে মানুষ আক্রান্ত না হয়, সেজন্য নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।